চব্বিশ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বুধবার (১৫ জুলাই) দুই দলের লড়াইয়ের আগে ফিরে দেখা যাক এই দ্বৈরথের সবচেয়ে বিতর্কিত পাঁচটি মুহূর্ত।
কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইতিহাসে মাত্র চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। আর শেষ চারে তাদের প্রতিপক্ষ সেই পুরোনো শত্রু—আর্জেন্টিনা।
দুই দলের ইতিহাসে অসংখ্য স্মরণীয় ও বিতর্কিত ঘটনা থাকলেও ২০০৫ সালের প্রীতি ম্যাচের পর আর কোনো প্রতিযোগিতামূলক বা প্রীতি ম্যাচে তাদের দেখা হয়নি। সেই দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে এই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
৫. রাট্টিনকে মাঠ থেকে বের করতে পুলিশের হস্তক্ষেপ
ঘটনাটি ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের। ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাট্টিনকে মাঠ থেকে বের করতে পুলিশের সহায়তা নেওয়া।
জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন অসন্তোষ প্রকাশের অভিযোগে রাট্টিনকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ভাষাগত সমস্যার কারণে তিনি সিদ্ধান্তটি বুঝতে পারেননি। একজন দোভাষী আনার দাবি জানিয়ে প্রায় ১০ মিনিট মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাঁকে বের করে নিয়ে যায়। সে সময় ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এই ঘটনাই পরবর্তীতে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ১১ জুলাই ৮৯ বছর বয়সে মারা যান আন্তোনিও রাট্টিন। তাঁর স্মরণে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে কালো বাহুবন্ধনী পরে খেলেছিল আর্জেন্টিনা।
৪. বার্তোনির ঘুষিতে ভেঙেছিল চেরির দাঁত
১৯৭৭ সালের একটি প্রীতি ম্যাচে ঘটে আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা। বুয়েনোস আইরেসের লা বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে ম্যাচের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি পেছন দিক থেকে কঠোর ট্যাকল করেন আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল বার্তোনিকে।

ট্যাকলের জবাবে উঠে দাঁড়িয়েই চেরির মুখে ঘুষি মারেন বার্তোনি। এতে চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। ঘটনার পর দুই খেলোয়াড়কেই মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন রেফারি।
এই ঘটনার মাধ্যমে ট্রেভর চেরি ইংল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে কোনো আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন।
৩. পচেত্তিনোর ফাউল, বেকহ্যামের পেনাল্টি
চব্বিশ বছর আগে দুই দলের সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়েও বিতর্কের জন্ম হয়েছিল। ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মাইকেল ওভেনকে ফাউল করার দায়ে আর্জেন্টিনার মৌরিসিও পচেত্তিনোর বিরুদ্ধে পেনাল্টির বাঁশি বাজান ইতালিয়ান রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা।

সেই স্পট কিক থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এক–শূন্য ব্যবধানে জয় এনে দেন ডেভিড বেকহ্যাম। এই জয়ে নকআউট পর্বে ওঠে ইংল্যান্ড, আর তৃতীয় হয়ে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
তবে বহু বছর পরও সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি পচেত্তিনো। ২০১৬ সালে টটেনহ্যামের কোচ থাকাকালে তিনি বলেন, "ওটা ছিল ওভেনের ডাইভ। ইংরেজ ফুটবল সব সময় ন্যায্য—এমনটা বিশ্বাস করবেন না। সে যেন সুইমিং পুলে ঝাঁপ দেওয়ার মতো পড়ে গিয়েছিল। আমি তাকে স্পর্শই করিনি।"
২. সিমিওনের প্ররোচনায় বেকহ্যামের লাল কার্ড
১৯৯৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ঘটে এই দ্বৈরথের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। প্রথমার্ধ শেষে ম্যাচের স্কোর ছিল দুই–দুই। ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেন অ্যালান শিয়ারার ও মাইকেল ওভেন। আর্জেন্টিনার হয়ে জাল খুঁজে পান গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও হাভিয়ের জানেত্তি।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মাত্র দুই মিনিট পর দিয়েগো সিমিওনের ফাউলের প্রতিক্রিয়ায় পা দিয়ে আঘাত করেন ডেভিড বেকহ্যাম। এতে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে তাঁকে মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি।
দশজন নিয়ে খেলেও ইংল্যান্ড ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নিতে হয়। ২০১৮ সালে কলম্বিয়াকে হারানোর আগে পর্যন্ত বিশ্বকাপের টাইব্রেকার যেন ইংল্যান্ডের জন্য অভিশাপই ছিল।
১. ‘হ্যান্ড অব গড’—ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত
আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড দ্বৈরথের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা তো বটেই, ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্তও এটি।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে গোলশূন্য অবস্থায় ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে বলের জন্য লাফিয়ে ওঠেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। কিন্তু মাথার বদলে হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে দেন তিনি। রেফারি আলি বিন নাসের সেটিকে বৈধ গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেন, যদিও ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে এই গোলই ইতিহাসে 'হ্যান্ড অব গড' নামে অমর হয়ে যায়।
আর মাত্র চার মিনিট পরই ম্যারাডোনা সৃষ্টি করেন আরেক ইতিহাস। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে চারজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে অসাধারণ এক গোল করেন তিনি। সেটি আজও 'শতাব্দীর সেরা গোল' হিসেবে পরিচিত।
শেষ পর্যন্ত দুই–এক গোলে ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। এক সপ্তাহ পর নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপাও জিতে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
এসি//