খেলাধুলা

তবু বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতায় অমর হালান্ড!

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের মঞ্চে সাফল্য আর আক্ষেপ যেন পাশাপাশি হাঁটে। এখানে এক ম্যাচেই কেউ নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হন, আবার ট্রফি ছাড়াই কেউ লিখে যান অনন্য ইতিহাস। সব মহান ফুটবলারের ভাগ্যে বিশ্বকাপ জোটে না, সবাই গোল্ডেন বুটও জেতেন না। তবু এমন কিছু পারফরম্যান্স থাকে, যা ট্রফির চেয়েও বেশি দিন স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের অভিযান ছিল ঠিক তেমনই এক গল্প।

রোববার (১২ জুলাই) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে নরওয়ে। শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়েছে তাদের স্বপ্নের দৌড়। একই সঙ্গে থেমে গেছে হালান্ডের গোল উৎসবও। দলের বিদায়ের কারণে আর মাঠে নামার সুযোগ নেই তার, ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াই থেকেও ছিটকে গেছেন এই নরওয়েজিয়ান তারকা।

বিশ্বকাপে নিজের নামের পাশে সাতটি গোল যোগ করেছেন হালান্ড। তবে সেমিফাইনালে উঠে যাওয়া লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যে আটটি করে গোল নিয়ে এগিয়ে থাকায় ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার এখন তার নাগালের বাইরে। কিন্তু একটি গোলের ব্যবধান তার অসাধারণ বিশ্বকাপকে কোনোভাবেই ম্লান করতে পারে না।

এটাই ছিল হালান্ডের প্রথম বিশ্বকাপ। অথচ মাঠে তার পারফরম্যান্সে অনভিজ্ঞতার কোনো ছাপ দেখা যায়নি। প্রথম ম্যাচ থেকেই গোল করার সহজাত ক্ষমতা দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, ক্লাব ফুটবলে যেমন বিধ্বংসী, জাতীয় দলের জার্সিতেও তিনি ঠিক ততটাই ভয়ংকর।

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য তিনি ছিলেন বড় আতঙ্ক। শক্তি, গতি, উচ্চতা এবং নিখুঁত ফিনিশিং—একজন আধুনিক স্ট্রাইকারের প্রয়োজনীয় সব গুণই যেন একসঙ্গে মিশে আছে তাঁর খেলায়। ডিফেন্ডারদের সঙ্গে প্রতিটি লড়াইয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

হালান্ডের সাতটি গোলও ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। কখনো হেডে, কখনো দুরন্ত গতির দৌড়ে, আবার কখনো এক ছোঁয়ায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছেন তিনি। প্রতিটি গোলই ছিল আলাদা গল্পের জন্মদাতা।

তবে তার বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত এসেছে শেষ ষোলোতে। প্রতিপক্ষ ছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ম্যাচের আগে খুব কম মানুষই নরওয়েকে এগিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই রাতে সব আলো নিজের দিকে টেনে নেন হালান্ড। জোড়া গোলে ব্রাজিলকে বিদায়ের পথ দেখিয়ে নরওয়েকে তুলেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারানো দলের তালিকায় যোগ হয় নরওয়ের নাম।

শুধু গোল করাই নয়, পুরো আসরজুড়ে দলের আক্রমণভাগের মূল ভরসা ছিলেন হালান্ড। প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা, প্রয়োজনের মুহূর্তে গোল করা কিংবা নিজের উপস্থিতিতেই ম্যাচের গতি বদলে দেওয়া—সব ভূমিকাতেই ছিলেন সমান কার্যকর।

প্রথম বিশ্বকাপেই সাত গোল করার কীর্তি ফুটবল ইতিহাসে বিরল। আরও বিরল হলো এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, যা একজন ফুটবলারকে অভিষেক আসরেই বিশ্বের সেরা গোলদাতাদের সারিতে বসিয়ে দেয়। গোলসংখ্যায় তাঁর ওপরে আছেন কেবল মেসি ও এমবাপ্পে, যারা এখনও সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন।

হালান্ডের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়তো এটাই—দল বিদায় নেওয়ায় ব্যক্তিগত লড়াইটাও শেষ হয়ে গেছে। নরওয়ে যদি আর একটি ধাপ এগোতে পারত, তাহলে গোল্ডেন বুটের সমীকরণ ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু নকআউট ফুটবল ভুল শুধরে নেওয়ার দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না।

তবু এই বিদায় হালান্ডের জন্য ব্যর্থতার নয়, বরং আত্মপ্রকাশের। তিনি প্রমাণ করেছেন, নরওয়ে এখন আর কেবল সম্ভাবনার দল নয়; বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদেরও কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। আর সেই নতুন নরওয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক ২৫ বছর বয়সী এই গোলমেশিন।

গোল্ডেন বুট হয়তো এবার তার হাতে উঠবে না। কিন্তু উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ হালান্ডকে এমন এক স্বীকৃতি দিয়েছে, যা অনেক ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়েও মূল্যবান। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের তালিকায় আর্লিং হালান্ডের নাম থাকবে সবার সামনের সারিতেই।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #আর্লিং হালান্ড #বিশ্বকাপ #ফিফা