এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয়—এমন ধারণাই এতদিন প্রচলিত ছিল। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলকে এডিসের কামড়ের প্রধান সময় হিসেবে ধরা হতো। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যাস্তের পরও এডিস মশা সক্রিয় থাকে। এমনকি রাত ৯টার দিকেও এ মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এদিকে বিদেশে পরিচালিত কয়েকটি গবেষণায় উঠে এসেছে, রাতে কৃত্রিম আলোর উপস্থিতি মশার চলাফেরা ও কামড়ানোর সময়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ঢাকার মতো শহরে বাড়তে থাকা সড়কবাতি, এলইডি বাতি ও অন্যান্য কৃত্রিম আলোর কারণে মানুষের এডিস মশার কামড়ের ঝুঁকির সময় বাড়ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে ঢাকার কৃত্রিম আলো সরাসরি ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়াচ্ছে—এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে বিভিন্ন মাত্রার কৃত্রিম আলো ও পরিবেশে এডিস মশার আচরণ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সূর্যাস্তের পরও সক্রিয় এডিস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করছেন।
তিনি বলেন, রাতে এডিস মশার সক্রিয়তার বিষয়টি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাতে মশার ঘনত্ব কিছুটা কম থাকলেও তারা মানুষকে কামড়ায়। আগে মূলত সকাল ও বিকেলকে এডিস মশার কামড়ের প্রধান সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অধ্যাপক কবিরুল বাশার ও তার সহকর্মীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯০৪টি মশা সংগ্রহ করে গবেষণা করেন। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মশার সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখতে পান, সন্ধ্যার পরও এডিস মশা সক্রিয় থাকে। রাত ৯টার দিকেও তাদের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।
তবে ওই গবেষণায় বিভিন্ন মাত্রার কৃত্রিম আলো থাকা এলাকার মশার আচরণের তুলনা করা হয়নি। ফলে রাতের কৃত্রিম আলো এডিস মশার সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে কি না, এই গবেষণার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ঢাকার রাতও হচ্ছে বেশি আলোকিত
গত কয়েক বছরে ঢাকার রাতের পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উপগ্রহের পর্যবেক্ষণ তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় রাতের কৃত্রিম আলোর বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষকদের হিসাবে, প্রতিবছর শহরের কৃত্রিম রাতের আলো প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে।
বিমানবন্দর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকায় তুলনামূলক বেশি আলোর ঘনত্ব দেখা গেছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরেও পুরোনো সড়কবাতির জায়গায় উজ্জ্বল সাদা এলইডি বাতির ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক এলাকা, বিভিন্ন ভবন ও জনসমাগমস্থলও আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় আলোকিত থাকছে।
তবে উপগ্রহের এসব তথ্য শুধু শহরে রাতের কৃত্রিম আলোর বিস্তার বাড়ার বিষয়টি দেখায়। এর সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
কৃত্রিম আলো মশার আচরণে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে
আন্তর্জাতিক কয়েকটি গবেষণায় কৃত্রিম আলোর কারণে রাতে মশার সক্রিয়তায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
২০২০ সালে পরীক্ষাগারে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার ৮২ শতাংশ দিনের বেলায় রক্ত পান করেছিল। রাতে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩০ মিনিট সাদা আলোর সংস্পর্শে রাখার পর রাতে রক্ত পান করা মশার হার বেড়ে ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়।
এরপর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার ওপর মাঠপর্যায়ে একটি গবেষণা করা হয়। সেখানে কৃত্রিম আলোর দূষণ বেশি এমন এলাকায় রাতে মশার সক্রিয়তা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরম দিনের পর এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট ছিল।
তবে বিদেশের এসব গবেষণার ফল সরাসরি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। কারণ মশার প্রজাতি, আবহাওয়া, তাপমাত্রা, পরিবেশ এবং কৃত্রিম আলোর ধরন ও মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন রেজা খান বলেন, কৃত্রিম আলো রাতে প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব সব প্রজাতির ক্ষেত্রে একই রকম নাও হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো মশা বা প্রাণীর ওপর আলোর প্রভাব কতটা, তা জানতে আলাদা ও সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রয়োজন আরও গবেষণা
বাংলাদেশে এ বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিবেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার সক্রিয়তা তুলনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি আলোর উজ্জ্বলতা, আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, রঙের তাপমাত্রা, কতক্ষণ আলো জ্বলছে এবং রাতের তাপমাত্রার মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের গবেষণার ফল না পাওয়া পর্যন্ত শহরের উজ্জ্বল রাতকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা যাবে না। তবে সূর্যাস্তের পরও শহরগুলো দীর্ঘ সময় আলোকিত ও সক্রিয় থাকায় এডিস মশা শুধু দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে—এমন প্রচলিত ধারণা নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এসি//