খেলাধুলা

মেসিদের হার দেখতে মুখিয়ে লাতিন আমেরিকার একাংশ!

স্পোর্টস ডেস্ক

আর্জেন্টিনায় মেসির মুর‌্যাল ছবি: আল জাজিরা

বিশ্বকাপের মঞ্চে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দল ফাইনালে উঠলে সাধারণত লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ সমর্থকই আঞ্চলিক সংহতির জায়গা থেকে তাদের সমর্থন করেন। অতীতের বিভিন্ন বিশ্বকাপেও এমন চিত্র দেখা গেছে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরে সেই পরিচিত দৃশ্য যেন বদলে গেছে। ইউরোপের স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, অথচ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো স্রোত। অনেক সমর্থক প্রকাশ্যেই চাইছেন, শিরোপা উঠুক স্পেনের হাতেই।

ব্রাজিল, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, চিলিসহ লাতিন অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টিনার পরাজয় কামনা করে অসংখ্য পোস্ট, রসিকতা ও মিম ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জনমত জরিপের ফল নয়, তবু আল জাজিরায় প্রকাশিত এএফপির একটি প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অনলাইন প্রতিক্রিয়াতেও আর্জেন্টিনাবিরোধী মনোভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে একটি মিম, যেখানে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকে ব্রাজিলের জার্সিতে দেখানো হয়েছে। ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে একটি বার্তা—এখন ব্রাজিলের মানুষের ভরসা ইয়ামাল। অনেক ব্রাজিলিয়ান সমর্থকের আশঙ্কা, আর্জেন্টিনা এবার শিরোপা জিতলে বিশ্বকাপের সংখ্যা দাঁড়াবে চারে, যা তাদের পাঁচ শিরোপার আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

তবে বিষয়টি শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ফুটবল বৈরিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও চিলির অনেক সমর্থকও প্রকাশ্যে স্পেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে বিশ্বকাপের স্টিকার বিক্রেতা ফ্রান্সিসকো সান্তোসের মতে, আর্জেন্টিনার চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের চেয়ে স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপা অর্জনই তার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। একই ধরনের মত দিয়েছেন কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার ফুটবলপ্রেমী হুয়ান কামিলো আবুসাইদ, যিনি প্রকাশ্যেই স্পেনকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মত জানতে চান। উপস্থিত সাংবাদিকদের অধিকাংশই স্পেনের নাম উচ্চারণ করেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আর্জেন্টিনার প্রতি এই বিরূপ মনোভাবের পেছনে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে।

প্রতিপক্ষ সমর্থকদের একটি অংশের বিশ্বাস, চলতি বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের কিছু সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে। বিশেষ করে পেনাল্টি, হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডসংক্রান্ত কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আলোচিত বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তকে ফুটবলের আইন অনুযায়ী সঠিক বলেই ব্যাখ্যা করেছেন সাবেক রেফারি ও বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ফিফাও আর্জেন্টিনাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ বারবার নাকচ করেছে।

এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিওনেল মেসিকে ফিফার বিশেষ পছন্দের ফুটবলার হিসেবে তুলে ধরার একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। লাতিন আমেরিকার কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানীর মতে, ডিজিটাল যুগের মিম সংস্কৃতি এবং অনলাইন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রচারণা এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে।

শুধু সেটিই নয়, আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক ও খেলোয়াড়ের অতীতের আচরণও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক উদ্‌যাপন, বর্ণবাদী স্লোগানের অভিযোগ এবং জয় উদ্‌যাপনের সময় অতিরিক্ত বিদ্রূপ—এসব বিষয়ও অনেক নিরপেক্ষ সমর্থককে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অবস্থান নিতে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইকে ঘিরে রাজনৈতিক মতভেদও চিলিসহ কয়েকটি দেশের সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আর্জেন্টাইনরাও অবশ্য নিজেদের ঘিরে তৈরি হওয়া এই ভাবমূর্তি সম্পর্কে সচেতন। দেশটির একটি জনপ্রিয় পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি একটি বিজ্ঞাপনে বিষয়টি রসিকতার ছলে তুলে ধরেছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের আর্জেন্টিনার ফুটবল উন্মাদনা নিয়ে অভিযোগ করতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনটির মূল বার্তা—অন্যদের কাছে অসহনীয় মনে হলেও নিজেদের এই পরিচয় নিয়েই গর্বিত আর্জেন্টাইনরা।

তবে পুরো লাতিন আমেরিকা যে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, এমনটিও নয়। পেরুর অনেক সমর্থক আঞ্চলিক ঐক্যের কথা উল্লেখ করে মেসিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আর্জেন্টিনার প্রতিটি অনুশীলনেও লিওনেল মেসিকে ঘিরে দেখা গেছে বিপুল দর্শক উন্মাদনা।

বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ১টায় নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। মাঠে লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালদের লড়াই যেমন নজর কাড়বে, তেমনি গ্যালারির বাইরে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলবে আরেকটি ভিন্ন লড়াই—সমর্থনের, আবেগের এবং লাতিন আমেরিকার ফুটবল রাজনীতির।

 

এসি//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #বিশ্বকাপ #ফিফা #লাতিন আমেরিকা #মেসি