যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ছয় দিন পর জ্ঞান ফিরেছে দণ্ডিত আসামি ক্রিস্টা পাইকের। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং কথা বলতে পারছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।
৫০ বছর বয়সী পাইককে হাসপাতালে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে তার জরুরি চিকিৎসা চলছে। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ হতে তার দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়। তাকে দুই দফা ইনজেকশন দেয়া হলেও তিনি মারা যাননি।
এরপর দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিৎসকেরা তার শরীরে দেয়া রাসায়নিকের প্রভাব কমাতে এবং ইনজেকশনের ওষুধ অপসারণে চিকিৎসা শুরু করেন। কয়েক দিন অচেতন থাকার পর এখন জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন পাইক এবং কথা বলছেন।
তার আইনজীবীরা ঘটনাটিকে ‘চিকিৎসাগতভাবে অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে তার শারীরিক অবস্থার ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ফোর্ডহ্যাম ল স্কুলের অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী ডেবোরা ডেনো বিবিসিকে বলেন, পাইকের জ্ঞান ফিরে পাওয়া এবং কথা বলতে পারার ঘটনায় তিনি ‘একেবারে হতবাক’ হয়েছেন।
ডেনো জানান, যুক্তরাষ্ট্রে আরও সাতটি ঘটনা রয়েছে, যেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া থেকে বন্দিরা বেঁচে গেছেন। তবে সেসব ঘটনায় বন্দিদের শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ কার্যকরভাবে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি।
তার মতে, প্রাণঘাতী রাসায়নিক শরীরে প্রবেশের পরও বেঁচে থাকার দিক থেকে পাইকের ঘটনা ব্যতিক্রম। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নির্ধারিত ধাপগুলো অনুসরণ করা হলেও তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
পাইককে পেন্টোবার্বিটাল নামের একটি রাসায়নিকের দুই ডোজ দেয়া হয়েছিল। তবে কেন ওই ওষুধ প্রাণঘাতী প্রভাব তৈরি করেনি, সে বিষয়ে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ। তাকে ভবিষ্যতে আবার মৃত্যুদণ্ড দেয়ার চেষ্টা করা হবে কি না, সেটিও জানানো হয়নি।
ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য রাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। একই সময়ে রাজ্যের কারা বিভাগের প্রধানও পদত্যাগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
পাইকের চিকিৎসক দলের উপদেষ্টা ও অবেদনবিদ ড. জোয়েল জিভোট বলেন, প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেয়ার পর পাইকের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। সাধারণত এ ধরনের ইনজেকশন দেয়ার পর বন্দির মৃত্যু হয়।
তবে পাইকের ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তার শরীরে কতটা পেন্টোবার্বিটাল প্রবেশ করেছিল, ইনজেকশনের পর রক্তে ওই রাসায়নিকের মাত্রা কত ছিল এবং ভবিষ্যতে তার শারীরিক অবস্থা কেমন হতে পারে- এসব এখনো পরিষ্কার নয়।
জিভোটের ধারণা, পেন্টোবার্বিটাল হয়তো পাইকের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ না করে ত্বকের নিচের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইনজেকশন দেয়ার পর চিকিৎসা শুরু করতেও কিছুটা সময় লেগেছিল। এতে তার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে পাইকের আইনজীবীরা সতর্ক করেছিলেন, তার শারীরিক গঠন, সরু শিরা ও থ্রম্বোসাইটোসিসের কারণে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেয়ার সময় অতিরিক্ত ব্যথা ও যন্ত্রণা হতে পারে।
মঙ্গলবার তারা জানান, ইনজেকশন দেয়ার প্রক্রিয়ায় তার দুই বাহু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি মৃত্যুদণ্ডে ত্রুটি বা গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছিল। প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেয়ার সময় শিরায় নির্ভরযোগ্যভাবে প্রবেশের পথ তৈরি করতে না পারাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
টেনেসিতেও চলতি বছরের শুরুতে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। ১৯৯৪ সালে তিনজনকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া মে মাসে স্থগিত করা হয়। প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেয়ার জন্য তার শিরা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন কর্মকর্তারা। পরে টেনেসির গভর্নর তার মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত করেন।
পাইক ১৮ বছর বয়সে তার তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে কলিন স্লেমারকে হত্যা করেন। সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরিচালিত একটি কর্ম প্রশিক্ষণ শিবিরে তাদের পরিচয় হয়েছিল।
এদিকে, পাইকের আইনজীবীদের আজ বুধবার ন্যাশভিলের আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতে শুনানি শেষে তারা সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানা গেছে।
সূত্র: বিবিসি
এসি//