লালনের গান কেবল গান নয়, বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনদর্শনের এক অনন্য প্রকাশ। সেই দর্শনকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন ফরিদা পারভীন। তার কণ্ঠে লালনগীতি পেয়েছিল আলাদা এক আবেগ, গভীরতা ও স্বাতন্ত্র্য। দেশের সীমানা পেরিয়ে তাঁর গানের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও।
গত বছরের এই দিনে থেমে যায় সেই কণ্ঠ। আজ কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রথম প্রয়াণ দিবস। বিশেষ এই দিনে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে তাকে।
ফরিদা পারভীনের স্মরণে সকালে চ্যানেল আইতে প্রচার হয়েছে ‘গান দিয়ে শুরু’। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত বংশীবাদক ও ফরিদা পারভীনের জীবনসঙ্গী গাজী আবদুল হাকিম। বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে প্রচার হবে তাকে নিয়ে বিশেষ সাময়িকী। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা ও উপস্থাপনা করবেন আবদুর রহমান।
বাংলাদেশ বেতারেও থাকছে বিশেষ আয়োজন। দুপুরের অনুষ্ঠানে ফরিদা পারভীনের গান পরিবেশন করবেন নাসরিন আক্তার বিউটি ও সাজিয়া সুলতানা পুতুল। বাঁশিতে সঙ্গত করবেন গাজী আবদুল হাকিম।
গানের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে লালন ও বাংলা লোকসংগীতের সুর পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্নও দেখতেন ফরিদা পারভীন। সেই ভাবনা থেকেই প্রায় ১৭ বছর আগে গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি’ সংগীত একাডেমি। তার প্রয়াণ দিবসে এই প্রতিষ্ঠানেও থাকছে বিশেষ স্মরণ আয়োজন। কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা সেখানে ফরিদা পারভীনের জীবন, সংগীতচর্চা ও অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন।
জীবনের শেষ সময়েও ‘অচিন পাখি’ ঘিরেই ছিল তার অনেক স্বপ্ন।
গাজী আবদুল হাকিম জানান, বাংলা লোকগানকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন ফরিদা পারভীন। চেয়েছিলেন, সুরের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হোক নতুন প্রজন্ম। সেই স্বপ্নের পথেই নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়ায় জন্ম ফরিদা পারভীনের। ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতে হাতেখড়ি তার। পরে নজরুলসংগীত ও ধ্রুপদী সংগীতে দীক্ষা নেন। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন।
স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকার সময় লালনসংগীতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। ১৯৭৩ সালে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় লালনগীতির নতুন অধ্যায়। এরপর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও তালিম নেন তিনি।
১৯৭৬ সালে ‘অচিন পাখি’ নামে তার প্রথম দীর্ঘবাদন রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এরপর অ্যালবাম, চলচ্চিত্র ও মঞ্চ—সবখানেই লালনের গানকে নিজের কণ্ঠে তুলে ধরেছেন তিনি। দীর্ঘ সংগীতজীবনে লালনগীতির প্রতি তার নিবেদনই তাকে শ্রোতাদের কাছে এনে দেয় ‘লালনসম্রাজ্ঞী’ পরিচয়।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ গায়িকা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
ফরিদা পারভীন নেই, কিন্তু তার কণ্ঠে বেঁচে আছে লালনের গান। তার গাওয়া সেইসব সুর আজও মনে করিয়ে দেয়—শিল্পী চলে যান, কিন্তু তার কণ্ঠে বোনা গান থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
এসি//