ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে সাগরে ভাসতে থাকা ১৫ বাংলাদেশি ও ৩২ মিশরীয় নাগরিকসহ ৪৭ জনকে উদ্ধার করেছে ডেনমার্কের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মায়েরস্ক’। পরে তাদের মিশরীয় নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে তাদের পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশিদের বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয় কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস।
সম্প্রতি দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে এবং প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন পোর্ট সাঈদে যান। সেখানে তারা সুয়েজ ক্যানাল কর্তৃপক্ষের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে হেফাজতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি তাদের আইনি সহায়তা এবং দ্রুত দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা করা হয়।
পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের পুলিশ প্রধান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করেন, ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ১৫ বাংলাদেশি নাগরিক বর্তমানে তাদের হেফাজতে রয়েছেন। পরে দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে সমুদ্রে আটকে পড়ার ঘটনা এবং লিবিয়া থেকে যাত্রার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেন।
বাংলাদেশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তারা আলাদাভাবে লিবিয়ায় যান। সেখানে অবস্থানের সময় ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের উদ্দেশ্যে কেউ মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আবার কেউ কেউ লিবিয়ার বিভিন্ন মাফিয়া চক্রের হাতে আটক হওয়ার পর তাদের মাধ্যমেই সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার উদ্যোগ নেন।
ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য পাচারকারীদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেন। এ অর্থের জোগান দিতে কয়েকজন বাংলাদেশে থাকা জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রায় ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আটক বাংলাদেশিরা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জানান, গত ১০ জুলাই দিবাগত রাতে ১৫ বাংলাদেশি ও ৩২ মিশরীয়সহ ৪৭ জন একটি রাবারের নৌকায় লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। নৌকাটি স্পিডবোটের ইঞ্জিনে চললেও এতে কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। তাদের জানানো হয়েছিল, সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছাতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে।
তবে নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় নৌকাটি নির্দিষ্ট পথ হারিয়ে ফেলে। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সাগরে ঘোরার পর একপর্যায়ে নৌকার জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে সাগরের মধ্যে ভাসতে থাকে।
প্রায় দুই দিন তিন রাত খাবার ও পর্যাপ্ত পানীয় জল ছাড়াই সাগরে অবস্থান করতে হয় তাদের। রাতে দূরে কোনো জাহাজের আলো দেখা গেলে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সাহায্যের সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।
শেষ পর্যন্ত ডেনমার্কের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মায়েরস্ক’ তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে। পরে ৪৭ জনকে মিশরীয় নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। নৌবাহিনী তাদের পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে সাগরে আটকে থাকায় ১৫ বাংলাদেশির অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ হলেও বর্তমানে তারা দ্রুত দেশে ফিরে যেতে চান।
পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে থাকা বাংলাদেশিরা হলেন—মুন্সিগঞ্জের মো. শাওন খান, সুনামগঞ্জের মো. সাজুর আহমেদ, সুনামগঞ্জের সুলেমান মিয়া, হবিগঞ্জের মো. সবুজ আহমেদ, হবিগঞ্জের মো. সারওয়ার হোসেন, সুনামগঞ্জের মো. সেলিম হোসেন, ফরিদপুরের মো. সাইম শেখ, কিশোরগঞ্জের মো. তোফায়েল হোসেন, হবিগঞ্জের জয় শেখ, সিলেটের জয়নাল উদ্দিন, হবিগঞ্জের আব্দুল আওয়াল চৌধুরী, সুনামগঞ্জের মো. মেহেদী হাসান, সুনামগঞ্জের মো. মাসুম মিয়া, হবিগঞ্জের মো. শিহাব উদ্দিন এবং তুহিন মিয়া।
দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, মিশরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব ১৫ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাদের বৈধ পাসপোর্ট নেই, তাদের দেশে ফেরানোর জন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অনুমতিপত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি সম্পর্কে বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে জীবন ঝুঁকিতে না ফেলার জন্যও সতর্ক করেছে দূতাবাস।
এসি//