মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকাদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। এবার তার সামনে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চ—প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগের দিন ছিল ইয়ামালের ১৯তম জন্মদিন। টেক্সাসের আর্লিংটনে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ঝলমলে গলার চেইন পরে হাসিমুখেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন এই তরুণ।
সেখানেই তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, জন্মদিনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত উপহার কী?
হাসিমুখে ইয়ামালের উত্তর ছিল, ‘এখনও খুব বেশি উপহার পাইনি। আমার সবচেয়ে বড় উপহার হবে মঙ্গলবারের ম্যাচে জয় আর নিউইয়র্কে বিশ্বকাপ ফাইনালে যাওয়ার টিকিট।’

পরদিন প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলেই ৯০ মিনিট শেষে জয় তুলে নেয় স্পেন। আর তাতেই পূরণ হয় ইয়ামালের জন্মদিনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা—বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা।
এবার দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বড় আন্তর্জাতিক ফাইনাল খেলতে নামার আগে জেনে নেওয়া যাক লামিন ইয়ামালের জীবন ও ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কিছু অধ্যায়।
বহুসাংস্কৃতিক শিকড়
স্পেনের বার্সেলোনার এসপ্লুগেস দে লোব্রেগাত এলাকায় জন্ম ইয়ামালের। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কো বংশোদ্ভূত এবং মা শেইলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির বংশোদ্ভূত।তার পুরো নাম লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। তবে স্পেন জাতীয় দল ও বার্সেলোনার হয়ে খেলেন শুধু লামিন ইয়ামাল নামেই। স্প্যানিশ ফুটবলে শুধু প্রথম নাম ব্যবহারের রীতি নতুন নয়। পেদ্রি, জাভি কিংবা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার মতো কিংবদন্তিরাও একই ধারা অনুসরণ করেছেন।

নামের পেছনের গল্প
‘লামিন’ নামটি পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত এবং এর শিকড় আরবি ভাষায়। এর অর্থ বিশ্বস্ত বা বিশ্বাসযোগ্য। অন্যদিকে ‘ইয়ামাল’ নামটি আরবি ‘জামাল’-এর একটি রূপ, যার অর্থ সৌন্দর্য, মাধুর্য বা শোভা। ধর্মীয় বিশ্বাসেও অনড় এই স্প্যানিশ তারকা। তিনি একজন অনুশীলনকারী মুসলিম। গোল করার পর তাকে প্রায়ই সিজদা দিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি
মাঠের বাইরেও ইয়ামাল প্রশংসা কুড়িয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে। চলতি বছরের শুরুতে বার্সেলোনার শিরোপা উদযাপন মিছিলে খোলা বাসে দাঁড়িয়ে তাকে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছার জবাব দিতে দেখা যায়। সেই দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

লা মাসিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চে
বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমির ছাত্র ইয়ামাল। ২০২৩-২৪ মৌসুমে প্রথমবার বার্সেলোনার মূল দলে সুযোগ পান। এরপর তার উত্থান এত দ্রুত হয়েছে যে অনেকের কাছেই তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। পরের মৌসুমেই বার্সেলোনাকে লা লিগা, কোপা দেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই তরুণ। গতি, ড্রিবলিং, সৃষ্টিশীল পাস ও আক্রমণভাগে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতার কারণে তার খেলার সঙ্গে প্রায়ই তুলনা করা হয় লিওনেল মেসি ও নেইমারের। শৈশবে মেসিকেই নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখতেন ইয়ামাল।
ইউরো ২০২৪: বিশ্বকে চমকে দেওয়া শুরু
দুই বছর আগে ইউরো ২০২৪-এ প্রথমবার পুরো বিশ্বকে নিজের প্রতিভা দেখান ইয়ামাল। স্পেনের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ও গোলদাতার রেকর্ড গড়েন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ চারটি অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে করেন চোখধাঁধানো একটি গোল। অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে উয়েফা তাকে টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত করে।

বিশ্বকাপ ২০২৬: নতুন অধ্যায়
বিশ্বকাপ শুরুর আগে পাওয়া একটি চোট শুরুতে তার ছন্দ নষ্ট করেছিল। গ্রুপ পর্বে প্রত্যাশামতো খেলতে না পারলেও নকআউট পর্বে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন স্পেনের সবচেয়ে বড় আক্রমণভাগের অস্ত্র। এ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল করলেও সতীর্থদের জন্য অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেছেন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দলের পাওয়া পেনাল্টিটিও আদায় করে দেন তিনিই। তার অবদানে স্পেন বিদায় করেছে পর্তুগাল ও ফ্রান্সকে। ফলে বিদায় নিতে হয়েছে দুই সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে।এবার ফাইনালে তার সামনে অপেক্ষা করছে শৈশবের আদর্শ লিওনেল মেসির বিপক্ষে খেলার সম্ভাবনা।
ইতিহাসের দুয়ারে
বিশ্বকাপের ফাইনালে খেললে ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে এই কীর্তি গড়বেন ইয়ামাল। তার চেয়ে কম বয়সে ফাইনাল খেলেছেন শুধু ব্রাজিলের পেলে ও ইতালির জিউসেপ্পে বেরগোমি। ফাইনালে স্পেন জিততে পারলে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইউরো ও বিশ্বকাপ—ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুটি শিরোপা জয়ের বিরল কীর্তি গড়বেন তিনি।
আরেকটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যানও রয়েছে তার নামের পাশে।
ইয়ামাল শুরুর একাদশে থাকা অবস্থায় ইউরো ও বিশ্বকাপে স্পেন এখন পর্যন্ত ১২টি ম্যাচ খেলেছে এবং প্রতিটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে। এই দুই প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শতভাগ জয়ের এমন রেকর্ড ইউরোপের আর কোনো ফুটবলারের নেই।

ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অর্জন
- বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা চ্যাম্পিয়ন (২০২২-২৩, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬)
- কোপা দেল রে জয় (২০২৪-২৫)
- স্প্যানিশ সুপার কাপ জয় (২০২৫ ও ২০২৬)
- স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন
- উয়েফা নেশনস লিগ ২০২৪-২৫ আসরে রানার্সআপ
- ২০২৫ সালের ব্যালন ডি'অর পুরস্কারে রানার্সআপ
১৯ বছর বয়সেই লামিন ইয়ামাল শুধু ভবিষ্যতের তারকা নন, বরং বর্তমান ফুটবলের অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এবার বিশ্বকাপের ফাইনালে তার সামনে সুযোগ, নিজের নামটি স্থায়ীভাবে ফুটবল ইতিহাসের সোনালি পাতায় লিখে রাখার।
এসি//