বিশ্বকাপের মঞ্চে অনেক ফুটবলারই ইতিহাস গড়েন। কেউ গোল করে, কেউ ট্রফি জিতে। তবে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স ইতিহাস লিখেছেন ভিন্ন এক কারণে। নরওয়েকে হারানোর পর মাঠে হাঁটু গেড়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন তিনি। সেই মুহূর্তেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ডের প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেন ২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার।
নরওয়ের বিপক্ষে ১১ জুলাইয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় ইংল্যান্ড। কিন্তু সেই জয়ের আনন্দের মধ্যেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন স্পেন্স। কারণ কোটি দর্শকের সামনে তার সিজদাহ নয়, বরং হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত তুলে দোয়া করার দৃশ্যটি ছিল ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগেই নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছিলেন স্পেন্স।
তিনি বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে খেলতে পারা তার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বড় বিষয় হলো, তাকে দেখে নতুন প্রজন্মের অসংখ্য শিশু সাহস পাবে এবং বিশ্বাস করবে—তারাও একদিন দেশের হয়ে খেলতে পারে।

স্পেন্সের এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। চলতি বছরের মে মাসে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে তার চোয়াল ভেঙে যায়। সেই চোট নিয়েই বিশ্বকাপে কার্বন-ফাইবারের বিশেষ মুখোশ পরে খেলছেন তিনি। বদলি হিসেবে সুযোগ পেয়ে ধীরে ধীরে কোচের আস্থা অর্জন করেছেন। এরপর রক্ষণভাগে নিজের জায়গা পাকা করে হয়ে উঠেছেন দলের নির্ভরযোগ্য সদস্য।
জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা স্পেনের জাতীয় দলে মুসলিম ফুটবলার নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু ইংল্যান্ডে এই অধ্যায়ের সূচনা হলো জেড স্পেন্সের হাত ধরে। অনেকের কাছেই এটি ছিল বহুদিনের অপেক্ষার অবসান।
লন্ডনের ২৩ বছর বয়সী ইংল্যান্ড সমর্থক জেইন গন্ডাল বলেন, স্পেন্স যে মুসলিম—এটি জানার পর তার প্রতি নিজের ভালো লাগা আরও বেড়ে গেছে। তার মতে, মুসলিম খেলোয়াড়দের মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। মাঠে প্রতিবার সুযোগ পেয়েই স্পেন্স যেভাবে রক্ষণ সামলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
স্পেন্সের এই পথচলার আরেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সাবেক ফুটবলার রিজ রহমান। তার ভাই জেশ রহমান ছিলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা প্রথম মুসলিম ফুটবলার। দীর্ঘ ১৫ বছর প্রফেশনাল ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনে কাজ করে মুসলিম ফুটবলারদের জন্য নামাজের কক্ষ, রমজানে রোজা ভাঙার বিরতি এবং ধর্মীয় সচেতনতা তৈরির মতো নানা উদ্যোগে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

টটেনহ্যাম হটস্পারে চোট কাটিয়ে ফেরার পর রমজান মাসে স্পেন্সের সঙ্গে পরিচয় হয় রিজ রহমানের।
তিনি জানান, কয়েক বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেন স্পেন্স। তার বিশ্বাস, এই পরিচয় স্পেন্সকে বদলে দেবে না; বরং নিজের বিশ্বাসের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, স্পেন্স এখন তরুণ মুসলিম ফুটবলারদের জন্য একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন, একজন খেলোয়াড়ের কাঁধে পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার ভার চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রত্যেক মানুষই নিজের বিশ্বাসের পথে এগিয়ে যান, স্পেন্সও তার ব্যতিক্রম নন।
দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের সংগঠন ‘দ্য সিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা শাবনা জহির স্পেন্সের সেই দোয়ার ছবি দেখেই জানতে পারেন, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তার ভাষায়, ইংল্যান্ডের কোনো ফুটবলারের কাছ থেকে আগে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে আনন্দের পাশাপাশি তার মনে উদ্বেগও কাজ করেছে। কারণ মুসলিম পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
‘দ্য সিন’-এর সৃজনশীল পরিচালক ড্যানিয়েল বেনেট অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ইতিবাচকভাবে। তার মতে এমন সময়ে স্পেন্সের মতো একজন ফুটবলারের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, যখন মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের প্রায়ই বিভাজন কিংবা বিতর্কের দৃষ্টিতে দেখা হয়। যদিও তিনি স্বীকার করেন, একটি ঘটনা রাতারাতি সমাজ বদলে দিতে পারে না।

এদিকে গোলরক্ষক প্রশিক্ষক ও স্কাউট মার্ক ওভারঅল তৃণমূল ফুটবলে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় খেলোয়াড়দের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, এখনো কিছু স্কাউট প্রতিভা মূল্যায়নের সময় শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়দের অগ্রাধিকার দেন। তবে স্পেন্সের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স সেই মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
তার ভাষায় স্পেন্স প্রমাণ করেছেন—ধর্ম বা বিশ্বাস কোনো বাধা নয়। যোগ্যতা থাকলে যে কেউ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কারণ ফুটবল সবার খেলা।
শুধু মাঠেই নয়, সংস্কৃতির অঙ্গনেও জায়গা করে নিয়েছেন স্পেন্স। ব্রিটিশ গায়ক ও গীতিকার বেন চিপোলা তাকে নিয়ে লিখেছেন ‘টোটাল ইক্লিপস অব জেড স্পেন্স’ নামে একটি গান। সেখানে ধারে খেলতে যাওয়া এক তরুণের ইংল্যান্ডের জার্সিতে ইতিহাস গড়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই কিছু গল্প রেখে যায়, যা ট্রফি বা পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। জেড স্পেন্সের গল্পও তেমনই। এটি শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বিশ্বাস, সংগ্রাম, সাহস এবং নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর এক অনন্য গল্প।
এসি//