আন্তর্জাতিক

কোরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াত দিয়ে বিশ্বনেতাদের জন্য ইরানের বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠান কেবল শোক প্রকাশের মাঝেই সীমাবদ্ধ রইল না। তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়োজিত এই বিদায়ানুষ্ঠানকে ইরান রূপ দিল এক অনন্য ও অভিনব কূটনৈতিক মঞ্চে। বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে সেখানে পবিত্র কোরআনের যে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা হয়েছে, তার পেছনে ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত রাজনৈতিক ও আদর্শিক বার্তা।

ডেলিগেট বা প্রতিনিধিদলভেদে পবিত্র গ্রন্থের আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে তেহরান মূলত বিভিন্ন দেশের প্রতি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, বন্ধুত্ব, ভর্ৎসনা এবং সতর্কবার্তার এক প্রতীকী সংকেত ফুটিয়ে তুলেছে। অনুষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়া হলেও এই 'কোরআনিক কূটনীতি'র মাধ্যমে মিত্রদের যেমন সম্মান ও উদ্দীপনা দেওয়া হয়েছে, তেমনি মধ্যপন্থী বা প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে দেওয়া হয়েছে কঠোর বার্তা।

উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মর্যাদা অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর মার্চ পাস্টের মাধ্যমে সম্মান জানানোর পর রণসংগীত যখন থেমে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ক্বারীর সুমিষ্ট কণ্ঠে কোরআনের আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমে ভাঙছিল নীরবতা। বিভিন্ন দেশের সামনে পঠিত সেই আয়াতগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রতিরোধ অক্ষ ও ভাতৃপ্রতিম মিত্রদের জন্য উদ্দীপনা

লড়াই, ত্যাগ এবং বিজয়ের মহিমাকে প্রাধান্য দিয়ে ইরানের ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের শরিকদের জন্য আয়াত বাছাই করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ:

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল যখন কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করছিল, তখন সুরা আলে ইমরানের ১৬৯ ও ১৭০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়— যেখানে আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীদের মৃত না ভেবে জীবিত এবং প্রতিপালকের কাছে সম্মানিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ শ্রদ্ধা জানাতে গেলে সুরা আল আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়, যা মুমিনদের আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূরণ এবং শাহাদাতের প্রতীক্ষায় থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেন:

লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের শোনানো হয় সুরা আলে ইমরানের ১৩৯ নম্বর আয়াত, যা যুদ্ধের ময়দানে মুমিনদের হীনবল না হয়ে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার নিশ্চয়তা দেয়। অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুথি প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে সুরা আলে ইমরানের ১৪৬ নম্বর আয়াত পাঠ করে সেইসব মুমিনদের প্রশংসা করা হয়, যারা বিপদেও কখনো দুর্বল বা নতিস্বীকার করেনি।

হামাস, তালেবান ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ:

ফিলিস্তিনের হামাসকে শোনানো হয় ওয়াদা পূরণের আয়াত। একই সাথে আমেরিকার বিরুদ্ধে টিকে থাকাকে সম্মান জানিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এবং ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের সামনে সুরা আল-ফাতহের ১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যার অর্থ— “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে একটি স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছি।”

তুরস্ক ও কাতার:

তুরস্কের প্রতিনিধিদলের সামনে সুরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে ঘরে বসে থাকা মানুষের তুলনায় জান-মাল দিয়ে জিহাদকারীদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়। আর কাতার সরকারের সামনে সুরা আলে ইমরানের ১৫২ নম্বর আয়াতের শেষাংশ পাঠ করে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহের বাণী শোনানো হয়।

সশস্ত্র লড়াইয়ের বাইরে আধ্যাত্মিক অংশীদারিত্ব

মিত্র রাষ্ট্র হলেও রাশিয়া, চীন বা ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোকে ইরান তাদের আদর্শিক বা সশস্ত্র লড়াইয়ের অংশীদার হিসেবে দেখাতে চায়নি। তাই তাদের সামনে কোনো যুদ্ধের আয়াত নয়, বরং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ন্যায়পরায়ণতার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

চীন:

চীনা প্রতিনিধিদের সামনে সুরা আনফালের ১০ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়, যা অন্তরের প্রশান্তি এবং এই বার্তা বহন করে যে, সাহায্য কেবল পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।

রাশিয়া:

রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের সামনে সুরা কাসাসের ৮৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে যে পরকালের চিরস্থায়ী আবাস কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত, যারা পৃথিবীতে উদ্ধত হতে বা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না।

ভারত:

প্রতিনিধিদলের সামনে  সূরা আলে-ইমরান ১৭৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। যার অর্থ: এদেরকে লোকে বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো; কিন্তু এটা তাদের ঈমান আরও দৃঢ়তর করেছিল আর তারা বলেছিল, ‘আল্লাহ্ই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক!

তিরস্কার ও প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা

সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে প্রতিপক্ষ কিংবা মধ্যপন্থী কিছু দেশের সামনে পড়া আয়াতগুলো, যা ছিল একাধারে ভর্ৎসনা ও সতর্কবার্তায় মোড়ানো।

সৌদি আরব:

সৌদি প্রতিনিধিদলের সামনে সুরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াতটি পাঠ করা হয়, যেখানে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ 'বদর'-এর প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে। সংখ্যায় কম হয়েও যেভাবে মুমিনরা কাফিরদের পরাস্ত করেছিল, সেই আয়াতটি নির্বাচনের মাধ্যমে তেহরান সম্ভবত রিয়াদের নিষ্ক্রিয়তা বা গোপন শত্রুতাকে তাচ্ছিল্য করেছে এবং বুঝিয়ে দিয়েছে যে ইরানের বিজয় কোনো বাহ্যিক শক্তির ওপর নয়, বরং ঐশ্বরিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

লেবানন ও মিশর:

লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সামনে সুরা মুহাম্মদের ৩৭-৩৮ এবং সুরা নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়। প্রয়োজনের সময় ত্যাগ স্বীকারে দ্বিধাগ্রস্তদের প্রতি ভর্ৎসনা সম্বলিত এই আয়াতের মাধ্যমে মূলত ইসরায়েলি আগ্রাসন মোকাবিলায় হিজবুল্লাহর মতো ভূমিকা রাখতে না পারায় লেবানন সরকারকে সরাসরি তিরস্কার করেছে তেহরান। অপরদিকে মিশরের প্রতিনিধিদলের সামনে সুরা আল-বায়্যিনাহর ৮ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পুরস্কারের কথা স্মরণ করানো হয়।

রাজনৈতিক ও আদর্শিক সম্পর্কের এই ভিন্নতাকে পবিত্র বাণীর মাধ্যমে যেভাবে ইরান ফুটিয়ে তুলেছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট আই

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #ইরান #আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি #কোরআনের আয়াত