ধর্ম

একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবে?

বায়ান্ন প্রতিবেদন

এই নশ্বর পৃথিবীতে সুখ ক্ষণস্থায়ী, আনন্দ এখানে মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। কিন্তু এর ঠিক ওপারেই রয়েছে এমন এক আবাসস্থল, যেখানে সুখ চিরন্তন আর আনন্দ অবিরাম। চিরস্থায়ী শান্তি, অফুরন্ত আনন্দ আর পরিপূর্ণ প্রশান্তির সেই আবাস হল জান্নাত। 

সেখানে নেই কোনো পাওয়ার আকুলতা, নেই কোনো হারানোর বেদনা; দুঃখ-কষ্টের তপ্ত নিঃশ্বাসও সেখানে পৌঁছাতে পারে না। এই চিরসুখের ঠিকানা কিন্তু সবার জন্য নয়। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনে জীবন কাটানো ঈমানদার বান্দা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণকারীদের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে এই অনন্ত সুখের ঠিকানা।

তবে জান্নাতের সবচেয়ে মধুর উপহারটি লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে। বিশ্বাসী মানুষেরা এই পৃথিবীতে যাদের ভালোবাসতেন, জান্নাতে গিয়ে তাদের ভুলে যাবেন না। মহান আল্লাহ পরম মমতায় মুমিন বান্দাদের তাদের আপনজন, প্রিয় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে আবার একত্রিত করবেন। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি দেখা যাবে নেককার দম্পতিদের ক্ষেত্রে, সেখানে তারা একসঙ্গে বসবাস করবেন চিরন্তন সুখ, ভালোবাসা ও শান্তির পরিবেশে।

কোরআনে আছে, ‘স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে এবং বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, তারাও তাদের সঙ্গে প্রবেশ করবে।’ (সুরা রদ, আয়াত : ২৩)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ জান্নাতে মুমিনদেরকে তাদের প্রিয়জনদের বা বাবা-মা, স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে যারা জান্নাতে প্রবেশের যোগ্য, তাদের সঙ্গে একত্রিত করবে, যাতে তাদের চোখ জুড়িয়ে যায়।’

জান্নাতের জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে এমন নারীদের ক্ষেত্রে, যারা পৃথিবীর জীবনে একাধিকবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন—পরকালে তারা কার সঙ্গে থাকবেন, জান্নাতে তার স্বামী কে হবেন? এসব প্রশ্ন বহুদিন ধরেই আলোচনার বিষয়।

ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো নেক বা ভালো নারী বিবাহিত অবস্থায় মারা গেলে জান্নাতে সে তার জান্নাতি স্বামীর সঙ্গে থাকবে। সে স্বামীর জন্য নির্ধারিত হুরদের নেত্রী হবে। আল্লাহ ওই নারীকে সবার চেয়ে অধিক সুন্দর ও মনোরম করে দেবেন।

কোনো নারীর যদি একাধিক স্বামী থাকে অর্থ্যাৎ প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর বা অন্য কোনো কারণে সে দ্বিতীয় বা একাধিক বিয়ে করে থাকে, তাহলে জান্নাতে সে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবে—এ বিষয়ে আলেমদের একাধিক মত পাওয়া যায়। 

১. ওই নারীকে ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে। যার সঙ্গে তার স্বভাব ও মানসিক মিল বেশি ছিল, তাকেই সে বেছে নেবে।

২. সে তার শেষ স্বামীর সঙ্গে জান্নাতে থাকবে। আবু দারদা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারীকে তার শেষ স্বামীই দেওয়া হবে।’ (তাবরানি: ৩১৩০)

৩. ওই নারী সেই স্বামীর সঙ্গে থাকবে, দুনিয়াতে যে তার সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর আচরণ করেছিলেন। যে তার ওপর জুলুম করেছে বা তাকে কষ্ট দিয়েছে, সে নারী থেকে বঞ্চিত থাকবে। উম্মে সালামা (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘যদি কোনো নারীর দুজন স্বামী থাকে, তবে সে কার সঙ্গে থাকবে?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘তাকে পছন্দের সুযোগ দেওয়া হবে। সে সেই স্বামীকেই বেছে নেবে, যে দুনিয়াতে তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছিল। আর সেই স্বামীই জান্নাতে তার স্বামী হবে। হে উম্মে সালামা, উত্তম চরিত্রের অধিকারীরাই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করে।’ (আল মুজামুল কাবির)

৪. কিছু ইসলামি গবেষক ও আলেমের মতে, যদি একজন নারীর একাধিক স্বামীই ঈমান, চরিত্র ও আমলের দিক থেকে সমমর্যাদার হন, তাহলে তিনি তার সর্বশেষ স্বামীর সঙ্গেই জান্নাতে অবস্থান করবেন। অন্যদিকে, যদি স্বামীদের মধ্যে চরিত্র, নেক আমল বা আচরণের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকে, তবে ওই নারীকে পছন্দের সুযোগ দেওয়া হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন কিছু আলেম।

তবে এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে, একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কার সঙ্গে থাকবেন—এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সরাসরি ও সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা নেই। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা এবং ইসলামি পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা থেকে এ বিষয়ে নানা মত উঠে এসেছে। কেউ মনে করেন, তিনি শেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন; কেউ বলেন, তাঁকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হবে; আবার কারও মতে, তিনি সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের স্বামীর সঙ্গ লাভ করবেন।

তবে সব মতামতের ঊর্ধ্বে একটি বিষয় স্পষ্ট—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি জান্নাতবাসীদের জন্য এমন সুখ, প্রশান্তি ও তৃপ্তির ব্যবস্থা করবেন, যেখানে কোনো অপূর্ণতা, আক্ষেপ বা দুঃখের স্থান থাকবে না।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #জান্নাত #পৃথিবী