খেলাধুলা

এক বিশ্বকাপ, অসংখ্য গল্প: কী শিখিয়ে গেল ২০২৬?

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ শেষ। নতুন চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট জিতেছে লা রোহা। কিন্তু শিরোপা উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেও তৈরি হয়েছিল এক অস্বস্তিকর দৃশ্য।

স্পেন অধিনায়ক রদ্রি যখন বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সতীর্থরা অপেক্ষায়, কোটি কোটি দর্শকের চোখ সেই মুহূর্তে—ঠিক তখনই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকেই ট্রাম্পকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিতে হয়। এরপরই রদ্রি ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, আর সোনালি কনফেটিতে ভরে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।

এই অস্বস্তিকর দৃশ্য যেন পুরো বিশ্বকাপেরই প্রতিচ্ছবি। কারণ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল একই সঙ্গে দারুণ রোমাঞ্চকর, আবার নানা বিতর্কে ঘেরা এক আসর।

সবার কাছে একেক রকম বিশ্বকাপ

এই বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক ছিল না।

অনেক সমর্থকের কাছে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আতিথেয়তার অনন্য উদাহরণ। কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার সমর্থকদের উচ্ছ্বাস কিংবা বোস্টনে স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের উৎসবমুখর পরিবেশ সেই ছবিই তুলে ধরেছে।

আবার অনেকের কাছে এটি ছিল ভিন্ন অভিজ্ঞতার বিশ্বকাপ। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, কিছু দেশের নাগরিকদের ভিসা জটিলতা, ইরান দলের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ এবং সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া—এসব ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

মিশরের সমর্থকদের কাছে এই বিশ্বকাপ হয়তো চিরকাল মনে থাকবে শেষ ষোলোর বিতর্কিত রেফারিংয়ের জন্য, যেখানে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পরাজয়ের পর তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা মনে রাখবেন দলের অসাধারণ লড়াইয়ের মানসিকতাকে। একের পর এক কঠিন ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটি ফাইনালে পৌঁছেছিল। জর্ডান, ইরাক ও হাইতির মতো দেশগুলোর জন্য আবার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।

অঘটনের গল্পও ছিল

এই বিশ্বকাপে ছিল চমকও। কেপ ভার্দের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কিংবা নরওয়ের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া ছিল বড় বিস্ময়।

তবে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলই জায়গা করে নেয় সেমিফাইনালে। অর্থাৎ চমকের পাশাপাশি নিজেদের শক্তির প্রমাণও দিয়েছে ফুটবলের পরাশক্তিগুলো।

মাঠে হারলেও অনেক সমর্থক গান গেয়েছেন, নেচেছেন, নিজেদের দলকে উৎসাহ দিয়েছেন। আবার একই সময়ে রাজনৈতিক বিভাজনও ছিল স্পষ্ট। কিছু ইরানি সমর্থককে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগানের মুখে পড়তে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরান দলের ওপর ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধও আরোপ করেছিল।

গ্রুপ পর্ব থেকে ইরানের বিদায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব মার্কওয়েন মুলিন প্রকাশ্যে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, এতে তিনি এতটাই খুশি হয়েছেন যে গান গেয়েছেন, এমনকি নেচেও উদযাপন করেছেন।

রাজনীতির ছায়া

ফিফা সব সময়ই দাবি করে ফুটবল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে সেই অবস্থান বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

নিউইয়র্কে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সমর্থক বলেন, এই বিশ্বকাপ অনেকটা রাজনৈতিক সম্মেলনের মতো হয়ে উঠেছিল, যেখানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফ্লোরিয়ান বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য তিনি ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে এরপরও বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যায় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।

পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই গ্যালারিতে দেখা গেছে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পতাকা—যা বিশ্বকাপের রাজনৈতিক আবহকে আরও স্পষ্ট করেছে।

নতুন নায়ক, পুরোনো কিংবদন্তি

এই বিশ্বকাপে ফুটবল বিশ্ব পেয়েছে নতুন এক মহাতারকার ইঙ্গিত। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিনে ইয়ামাল নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন সবচেয়ে বড় মঞ্চে।

অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি দেখিয়েছেন, বয়স শুধু একটি সংখ্যা। অভিজ্ঞতা আর মেধা দিয়ে এখনও বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করা যায়।

স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোর মতো তুলনামূলক কম আলোচিত ফুটবলাররা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নায়ক হয়ে উঠেছেন। বিপরীতে জার্মানি ও পর্তুগালের কয়েকজন বড় তারকা প্রত্যাশার ছাপ রাখতে পারেননি।

ফুটবলের আমেরিকান সংস্করণ

বিশ্বকাপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র নিজের ক্রীড়া সংস্কৃতির ছাপও রেখেছে।

ম্যাচের মাঝপথে পানীয় বিরতি নিয়ে টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচার, বিজয়ীদের জন্য চ্যাম্পিয়নশিপ রিং এবং বিরতিতে বিশেষ আয়োজন—এসব অনেক দর্শকের কাছে ফুটবলকে আমেরিকান ধাঁচে উপস্থাপনের চেষ্টা বলেই মনে হয়েছে।

ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হওয়ার অন্যতম কারণ এর সহজলভ্যতা। একটি বল থাকলেই যে কেউ খেলতে পারে। কিন্তু এই বিশ্বকাপে মাঠে বসে খেলা দেখা অনেকের জন্য স্বপ্নই থেকে গেছে।

টিকিটের দাম ছিল কয়েকশ থেকে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত। ফলে অসংখ্য সাধারণ সমর্থকের পক্ষে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখা সম্ভব হয়নি।

লস অ্যাঞ্জেলেসের এক গাড়ি মেকানিক হুয়ান কর্টেস জানান, বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম তার কর্মস্থল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে হলেও টিকিটের দাম এত বেশি ছিল যে তিনি একটি ম্যাচও দেখতে পারেননি।

তার কথায়, "নিজের দেশে প্রতিদিন তো আর বিশ্বকাপ আসে না।"

শেষ পর্যন্ত ফুটবলই জিতেছে

ফাইনালকে অনেকেই নিউইয়র্কে হয়েছে বলে ভেবেছিলেন। বাস্তবে ম্যাচটি হয়েছিল নিউ জার্সিতে, যা শহর থেকে অনেকটা দূরে। গাড়িনির্ভর সেই স্টেডিয়ামে পৌঁছানোও ছিল বেশ কষ্টসাধ্য।

তবু সব বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর সমালোচনার মাঝেও বিশ্বকাপ তার আসল সৌন্দর্য হারায়নি।

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, নতুন তারকার জন্ম, কিংবদন্তিদের শেষ লড়াই, চোখের জল, আনন্দ আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত—সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ আরও একবার প্রমাণ করেছে, ফুটবলের সৌন্দর্য কোনো বিতর্কে আটকে থাকে না।

জার্মান কিংবদন্তি কোচ সেপ হারবার্গারের বিখ্যাত সেই কথাটিই যেন আবারও সত্য হয়ে উঠেছে—

"বল গোলাকার, খেলা ৯০ মিনিটের। বাকি সবই শুধু তত্ত্ব।"

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #বিশ্বকাপ #স্পেন #আর্জেন্টিনা #ফিফা ২০২৬