ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্কেও তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন। সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গে অবস্থান না মেলায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপের কয়েকটি দেশের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরান–এর বিরুদ্ধে চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ।
রয়টার্স–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন ইরানে পরিচালিত অভিযানে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে মতবিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মিত্র দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
ফ্রান্সের আকাশসীমা ব্যবহারে বাধা
সম্প্রতি ফ্রান্সের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইসরাইলে মার্কিন অস্ত্রবাহী বিমান যাওয়ার অনুমতি দেয়নি ফরাসি সরকার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন কঠোর পদক্ষেপ নিল। প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক পোস্টে ফ্রান্সকে ‘অত্যন্ত অসহযোগিতামূলক’ বলে কটাক্ষ করেন।
এর জবাবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জানান, তাদের এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধের শুরু থেকে নেওয়া ফরাসি নীতিরই অংশ।
এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ক্ষুব্ধ হয়ে জানিয়েছে, তারা এখন থেকে ফ্রান্সের সঙ্গে সব ধরনের সামরিক কেনাকাটা ও সম্পর্ক ছিন্ন করবে।
ইতালি ও স্পেনের কড়াকড়ি
শুধু ফ্রান্স নয়, ইতালিও গত সপ্তাহে তাদের সিসিলি দ্বীপের বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বোমারু বিমান অবতরণের অনুমতি দেয়নি।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, বিদ্যমান চুক্তির বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ঘাঁটি ব্যবহার করতে হলে বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন, যা এই ক্ষেত্রে দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্পেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার তীব্র সমালোচনা করে দেশটির আকাশসীমা মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্পেন জানিয়েছে, ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিগত যুদ্ধে তারা তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না।
ব্রিটেনের প্রতি ট্রাম্পের পরামর্শ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্রিটেনকেও ‘অসহযোগিতামূলক’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি ব্রিটিশ সরকারকে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে হরমুজ প্রণালিতে যান এবং সেটি দখল করুন।’
মজার বিষয় হলো, এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলা এপ্রিলে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন।
ন্যাটোর অভ্যন্তরে বিভক্তি
জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও দেশটির অভ্যন্তরে এই যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ার এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
মূলত ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও তার প্রধান ইউরোপীয় মিত্রদের (ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন) মধ্যে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ঐক্যকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এসি//