বিনোদন

নানা পাটেকরের শেষ বক্তব্য- ‘কাল বাঁচব কি না জানি না’

বিনোদন ডেস্ক

ভারতীয় চলচ্চিত্রে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাদের পরিচয় শুধু পর্দার চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়। অভিনয়ের বাইরে তাদের ব্যক্তিত্ব, জীবনবোধ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করে। নানা পাটেকর ছিলেন তেমনই একজন। পর্দায় শক্তিশালী অভিনয় আর তীক্ষ্ণ সংলাপে যিনি দর্শককে নাড়া দিয়েছেন, বাস্তব জীবনেও ছিলেন স্পষ্টভাষী ও মানবিক।

সেই নানা পাটেকর আর নেই।

তবে মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে তিনি এমন কিছু কথা বলে গিয়েছিলেন, যা তার চলে যাওয়ার পর নতুন করে মানুষের মনে দাগ কেটেছে। জীবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সেদিন নানা পাটেকার বলেছিলেন, ‘আমি জানি না কাল আমি বেঁচে থাকব কি না। জীবনের শেষ প্রান্তে সবাইকে পৌঁছাতেই হবে। কিন্তু তার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত যা করতে চেয়েছিলাম, তা কি করতে পেরেছি?’

কে জানত, কথাগুলো বলার মাত্র চার দিন পরই জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবেন তিনি!

গত ৪ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাউলায় ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন নানা পাটেকর। সাদা কুর্তা ও স্কার্ফ পরা সেই অনুষ্ঠানে নিজের জীবনের উপলব্ধি তুলে ধরার পাশাপাশি সমাজের প্রতি মানুষের দায়িত্বের কথাও বলেছিলেন তিনি।

ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গোয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত মনোহর পার্রিকরকে স্মরণ করে নানা পাটেকর বলেছিলেন, ‘আমাদের জগত যদি কেবল নিজেদের পরিবার, স্ত্রী আর সন্তানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই জীবনের অর্থ কী? সমাজ থেকে যা পেয়েছি, তার কিছুটা অন্তত ফিরিয়ে দিয়ে যেতে হবে।’

এই কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তার জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। খ্যাতি, অর্থ কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে সমাজের প্রতি মানুষের কিছু দায়িত্ব রয়েছে—শেষ বক্তব্যেও সেই চিন্তার কথাই সামনে এনেছিলেন তিনি।

শুধু সমাজের প্রতি দায়িত্ব নয়, নাগরিকের মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও শালীনতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন এই স্পষ্টভাষী অভিনেতা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কিছু আদর্শ আমার পছন্দ, আবার কিছু একদম পছন্দ নয়। সেটা স্পষ্টভাবে জানানোর সাহস থাকতে হবে। তিনি যা করেন সবই যে ভুল, তা কখনোই নয়। কোনো কিছু অপছন্দ হলে প্রতিবাদ করা নাগরিকের অধিকার, তবে সেই প্রতিবাদের ভাষাও শালীন হওয়া চাই। জনসম্মুখে কথা বলার সময় ন্যূনতম ভদ্রতা না থাকলে বক্তব্যের গুরুত্ব হারিয়ে যায়।’

জীবন নিয়ে এমন গভীর উপলব্ধির কথা বলার চার দিন পরই আসে সেই খবর, যা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে ভক্তদের জন্য। বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর ভোরে গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন নানা পাটেকর। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুকালে তার ছেলে মালহার পাটেকর পুনেতে ছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি গোয়ার উদ্দেশে রওনা হন।

নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ভারতীয় চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি এমন অনেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে তার অভিনয় তাকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘সালাম বম্বে’ থেকে ‘নটসম্রাট’—বিভিন্ন চরিত্রে তার অভিনয়ের গভীরতা ও শক্তি তাকে সমকালীন অভিনেতাদের মধ্যে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। পেয়েছেন ভারতের অন্যতম বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রীও।

তবে নানা পাটেকরের পরিচয় কেবল পুরস্কার আর সফল ছবির তালিকায় আটকে নেই। তার অভিনয়ের মতোই তার কথাবার্তাতেও ছিল সরাসরি ভাব প্রকাশের প্রবণতা। সমাজ, মানুষ, দায়িত্ব কিংবা রাজনীতি—কোনো বিষয়েই নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে দ্বিধা করতেন না তিনি। আর সেই কারণেই তার বলা অনেক কথা পর্দার সংলাপের বাইরেও মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

মৃত্যুর চার দিন আগে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর আগে মানুষ কি নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করে, যা করতে চেয়েছিল, তা করতে পেরেছে কি না?

আজ নানা পাটেকর নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই প্রশ্নের সঙ্গে রয়ে গেছে দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অসংখ্য চরিত্র, শক্তিশালী সংলাপ আর সমাজের জন্য কিছু করে যাওয়ার বার্তা। একজন অভিনেতার পর্দা নামলেও তার সৃষ্টি থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সত্য।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #নানা পাটেকর