খেলাধুলা

বিশ্বকাপ ফাইনালের সংঘর্ষে তদন্তের মুখে আর্জেন্টিনা, কড়া শাস্তির ইঙ্গিত ফিফার

স্পোর্টস ডেস্ক

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হওয়ার কথা ছিল স্পেনের শিরোপা উদযাপনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু নিউ ইয়র্কের সেই রাত শেষ পর্যন্ত আলোচনায় আসে আরেকটি কারণে। স্পেনের ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায় দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায়। ম্যাচ-পরবর্তী সেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ে এবার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় কিংবা কোচদের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে জরিমানার শঙ্কায় রয়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এএফএ)।

ফিফা জানিয়েছে, বিশ্বকাপ ফাইনালের ম্যাচ-পরবর্তী ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখতে তাদের ডিসিপ্লিনারি কমিটি একজন ডিসিপ্লিনারি ও এথিকস প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছে। তদন্তে সংঘর্ষের প্রতিটি দিক পর্যালোচনা করা হবে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত জানাবে সংস্থাটি।

রোববার (১৯ জুলাই) নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশি বাজতেই স্পেনের খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ জয় উদযাপনে মেতে ওঠেন। আর সেই মুহূর্তেই দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

ঘটনায় আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মোলিনা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, থিয়াগো আলমাদা এবং সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

প্রথমদিকে ফিফার ম্যাচ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল, স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার গলায় ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ পারেদেসকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই তথ্য সংশোধন করা হয়।

পরে ফিফা বিবিসি স্পোর্টকে নিশ্চিত করে জানায়, ম্যাচ চলাকালে পারেদেসের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং তার নাম থেকে লাল কার্ডের রেকর্ডও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তবে ম্যাচেই আর্জেন্টিনা একজন খেলোয়াড়কে হারিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ।

বিশ্বকাপে এটি অবশ্য আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার একমাত্র তদন্ত নয়। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে নিজেদের দেশের দাবির সমর্থনে একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা। সেই ঘটনাতেও সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ফিফা।

শেষ বাঁশির পর কী ঘটেছিল?

রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর নিউ জার্সির মাঠে একেবারেই ভিন্ন দুই দৃশ্য দেখা যায়। আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার, যার মধ্যে লিওনেল মেসিও ছিলেন, হতাশায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন। অন্যদিকে স্পেনের খেলোয়াড়রা উল্লাসে ছুটে যান একে অপরের দিকে।

অতিরিক্ত সময়ে বদলি হয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়া স্পেন অধিনায়ক রদ্রিও ডাগআউট থেকে দৌড়ে সতীর্থদের উদযাপনে যোগ দিতে আসেন। সেই সময় নাহুয়েল মোলিনার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার তাকে হাতে বা পেটে আঘাত করেন বলে ভিডিওতে দেখা যায়। সেখান থেকেই উত্তেজনার সূচনা।

ঘটনার প্রতিবাদ করতে এগিয়ে যান রদ্রি। তবে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরিক গার্সিয়া সতীর্থের পাশে দাঁড়াতে এলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসও সেখানে জড়িয়ে পড়েন এবং গার্সিয়ার গলায় ধাক্কা দেন।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন স্পেনের গাভি। কিন্তু আর্জেন্টিনার থিয়াগো আলমাদা তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর পারেদেসও গাভির মুখে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলে তিনি আবারও পড়ে যান।

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা এক পর্যায়ে এরিক গার্সিয়ার গলার কাছে হাত দেন এবং পরে স্পেনের মিডফিল্ডার দানি ওলমোকে আঘাত করেন।

সমালোচনায় আর্জেন্টিনা

ঘটনার পর বিবিসির ধারাভাষ্যে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বলেন, পারেদেস কয়েকবার ঘুষি মারার চেষ্টা করেছেন। ফুটবলে এ ধরনের আচরণের কোনো স্থান নেই। হার কষ্টের হলেও পরাজয় মেনে নেওয়ারও একটি শালীন উপায় আছে। তার মতে, শেষ বাঁশির পর আর্জেন্টিনার প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক।

সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্টও একই সুরে বলেন, ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে। ফলাফল নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ ছিল না। এরপরও যেভাবে আচরণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

তবে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখেন।

তিনি বলেন, জয়ের মতো পরাজয়ও মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। দল ম্যাচে হেরেছে এবং সেই ফল মেনে নিয়েছে। তবে একটি হার তাদের এই পর্যন্ত আসার পুরো পথচলাকে মুছে দিতে পারে না।

কী ধরনের শাস্তি হতে পারে?

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির হাতে একাধিক শাস্তির সুযোগ রয়েছে। ডিসিপ্লিনারি ও এথিকস প্রসিকিউটর নিয়োগের অর্থ, শুধু সহিংস আচরণ নয়; শৃঙ্খলাভঙ্গের আরও বিস্তৃত বিষয় তদন্তের আওতায় আসবে।

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আপত্তিকর আচরণ ও ফেয়ার প্লের নীতিমালা উল্লেখ রয়েছে। খেলোয়াড় কিংবা কর্মকর্তাদের আচরণ যদি শোভন আচরণের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে অথবা ফুটবল ও ফিফার সুনাম ক্ষুণ্ন করে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তদন্তের সময় ঘটনার গুরুতর দিকের পাশাপাশি প্রশমনকারী পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিশ্বব্যাপী কার্যকর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করতে পারে ফিফা।

এর আগে স্পেনের সাবেক ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসের বিরুদ্ধেও একই বিধান প্রয়োগ করা হয়েছিল। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর জেনি হারমোসোকে সম্মতি ছাড়া চুমু দেওয়ার ঘটনায় তাকে তিন বছরের জন্য ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিলের আবেদনও খারিজ হয়ে যায়।

২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড় দেওয়ার ঘটনায় উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজকে চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে তিনি লিভারপুলের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমের প্রথম নয়টি ম্যাচ খেলতে পারেননি।

তবে পারেদেস, মোলিনা, আলমাদা কিংবা আয়ালার ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।

আগেও শাস্তির মুখে পড়েছে আর্জেন্টিনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েছে আর্জেন্টিনা। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা উদযাপনের সময় ফেয়ার প্লে ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। গোল্ডেন গ্লাভস হাতে অশোভন অঙ্গভঙ্গি করেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। পরে ড্রেসিংরুমে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বিদ্রূপ করতেও দেখা যায় তাকে। ওই ঘটনায় আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ১৮ হাজার ৩০০ পাউন্ড জরিমানা করা হলেও কোনো খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া হয়নি।

তবে ২০২৪ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে আপত্তিকর আচরণের কারণে মার্টিনেজকে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। চিলিকে হারানোর পর কোপা আমেরিকার প্রতিরূপ ট্রফি নিয়ে বিতর্কিত উদযাপন এবং কলম্বিয়ার কাছে হারের পর ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরায় আঘাত করার ঘটনাও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অংশ ছিল।

একই বছর কোপা আমেরিকা জয়ের পর এনজো ফার্নান্দেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক বলে অভিযোগ তোলে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন।

এবারের বিশ্বকাপেও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় সম্ভাব্য জরিমানার মুখে রয়েছে এএফএ। ২০১৪ সালেও একই ধরনের ব্যানার প্রদর্শনের কারণে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল।

ফিফা চাইলে ওই ব্যানার হাতে থাকা ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, জিওভানি লো সেলসো এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে।

তবে তদন্ত শেষ হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সীমা জানায়নি ফিফা। ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই উত্তপ্ত রাতের শেষ অধ্যায় লিখতে অপেক্ষা করতেই হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #২০২৬ বিশ্বকাপ #ফিফা #আর্জেন্টিনা #তদন্ত