খেলাধুলা

বিশ্বকাপের মঞ্চে কেইন-হালান্ডের মহারণ

স্পোর্টস ডেস্ক

ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। তবে দলগত লড়াইয়ের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুই তারকা স্ট্রাইকার—ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবং নরওয়ের আর্লিং হালান্ড।

ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে হালান্ডকে প্রশংসায় ভাসিয়ে কেইন বলেন, "সে অবিশ্বাস্য একজন খেলোয়াড়। গোল করার রেকর্ড, শারীরিক সক্ষমতা—সব মিলিয়ে সে যেন একটি মেশিন, সত্যিকারের এক দানব। তার ফিনিশিং বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের। তার গোলের পরিসংখ্যানই সব বলে দেয়।"

তবে নিজেদের তুলনা করতে নারাজ ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

কেইন বলেন, "আমরা দুজনই স্ট্রাইকার হলেও আমাদের খেলার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। আমি বল বেশি স্পর্শ করতে পছন্দ করি, আক্রমণ গঠনে অংশ নিতে ভালোবাসি। আবার প্রয়োজন হলে খাঁটি নম্বর নাইন হিসেবেও খেলতে পারি। তাই আমাদের তুলনা করার কিছু নেই। আমি তাকে খেলোয়াড় ও পেশাদার হিসেবে অনেক সম্মান করি। অবশ্য আশা করি, আগামীকাল সে খুব বেশি কিছু করতে পারবে না।"

এবারের বিশ্বকাপে প্রথম কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলেই চার ম্যাচে সাত গোল করেছেন হালান্ড। শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে তুলেছেন তিনি।

অন্যদিকে, টুর্নামেন্টে হালান্ডের চেয়ে মাত্র এক গোল কম করেছেন কেইন। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা এখন ১৪।

গোল্ডেন বুট নয়, লক্ষ্য বিশ্বকাপ

অসাধারণ গোল করার পরও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কেইন ও হালান্ডের চেয়ে এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০২৬ বিশ্বকাপে দুজনেরই গোলসংখ্যা আট।

২০১৮ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছিলেন কেইন। তবে সেবার সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড।

এবারও ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়ে দলগত সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

কেইন বলেন, "এবারের বিশ্বকাপে শীর্ষ স্ট্রাইকাররা নিয়মিত গোল করছে, যা সত্যিই দারুণ ব্যাপার। বড় টুর্নামেন্টে এমনটা সবসময় দেখা যায় না। এই প্রতিযোগিতা আমাকে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়।"

তিনি আরও বলেন, "আমার প্রধান লক্ষ্য গোল্ডেন বুট নয়, বিশ্বকাপ জেতা। তবে আমি একজন স্ট্রাইকার। আমি যদি গোল করি, সেটাই দলের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে।"

বিশ্বকাপ জিততে ইংল্যান্ডকে আরও একবার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়াই করার আহ্বানও জানান কেইন।

তার ভাষায়, "যতক্ষণ না আমরা ট্রফি জিতছি, ততক্ষণ ইংল্যান্ডকে নিয়ে নানা আলোচনা চলতেই থাকবে। তবে আমরা এখন এমন জায়গায় আছি, যেখানে ছয় সপ্তাহ আগে পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল। এখন শেষ আট দিনের শেষ লড়াই। স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সবাইকে নিজেদের সেরাটা দিতে হবে।"

হালান্ড-কেইনের লড়াইই নির্ধারণ করতে পারে ম্যাচ

নরওয়ের প্রধান কোচ স্তালে সলবাক্কেন মনে করেন, দুই স্ট্রাইকারের পারফরম্যান্স ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, "এটি অবশ্যই নরওয়ে বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচ। তবে এটাও গোপন কিছু নয় যে, ইংল্যান্ডের প্রধান ম্যাচজয়ী খেলোয়াড় কেইন, আর আমাদের জন্য সেই ভূমিকায় হালান্ড।"

২৬ বছর পর কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলছে নরওয়ে। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স করে তারা ইতোমধ্যেই ইতিহাস গড়েছে। বিশেষ করে শেষ ষোলোয় ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ছিল দলের অন্যতম সেরা অর্জন।

সলবাক্কেন বলেন, "নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই এটিও আরেকটি ঐতিহাসিক ম্যাচ।"

তিনি আরও বলেন, "চাপ অবশ্যই ইংল্যান্ডের ওপর বেশি। তবে আমরাও নিজেদের পারফরম্যান্স নিয়ে চাপ অনুভব করি। কিন্তু খেলা শুরু হয়ে গেলে ১১ বনাম ১১-এর লড়াইয়ে খেলোয়াড়রা এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না।"

এদিকে নরওয়ের বিশ্বকাপ যাত্রা দেশজুড়ে তৈরি করেছে উৎসবের আবহ। সমর্থকদের বিখ্যাত 'ভাইকিং রো' উদযাপন এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ। আর মাঠে গোল করার দক্ষতা ও মাঠের বাইরে প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের কারণে হালান্ডের জনপ্রিয়তাও আরও বেড়েছে।

সলবাক্কেন বলেন, "পুরো নরওয়ে আগামীকালের ম্যাচের অপেক্ষায় আছে। এই বিশ্বকাপে আমরা কয়েকটি অসাধারণ রাত উপহার দিয়েছি, যা পুরো দেশকে এক করেছে।"

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "হয়তো ভবিষ্যতে ২৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। এখন আমাদের বিশ্বাস আছে, আমরা নিয়মিত ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারব।"

তবে সব আলোচনার শেষ কথা একটাই—শনিবারের কোয়ার্টার ফাইনালে জিতবে কে? হালান্ডের বিস্ফোরক শক্তি, নাকি কেইনের অভিজ্ঞতা ও নিখুঁততা?

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক ম্যাচ কিংবদন্তি হয়ে আছে একক নায়কের কারণে। ইংল্যান্ড-নরওয়ে লড়াইটিও কি তেমন একটি ম্যাচ হয়ে উঠবে? উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই মহারণে চোখ থাকবে শুধু স্কোরবোর্ডে নয়, থাকবে দুই নম্বর নাইনের প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি দৌড় আর প্রতিটি শটে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #ফিফা বিশ্বকাপ #কোয়ার্টার ফাইনাল #হ্যারি কেইন #আর্লিং হালান্ড