খেলাধুলা

হালান্ডের গোপন ফিটনেস রহস্য: আদিম খাদ্যাভ্যাস আর মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুম

স্পোর্টস ফিচার

মাঠে বল পায়ে ছুটতে শুরু করলেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে নেমে আসে আতঙ্ক। শক্তি, গতি আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে একের পর এক গোল করে আলোচনার কেন্দ্রে নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আরলিং হালান্ড। বিশ্বকাপে গোলবন্যা হোক কিংবা ক্লাব ফুটবলে শিরোপা জয়—সবখানেই এখন তারই দাপট।

তবে মাঠের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের আড়ালে রয়েছে এমন একটি অভ্যাস, যা শুনলে অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আইটিভি নিউজ–এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হালান্ড প্রায়ই রাতে ঘুমানোর সময় নিজের মুখে বিশেষ ধরনের আঠালো টেপ বা স্কচটেপ ব্যবহার করেন।

প্রথম শুনে বিষয়টি অদ্ভুত কিংবা ব্যতিক্রমী মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হালান্ড বিশ্বাস করেন, এই অভ্যাস তার ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করে এবং শরীরকে আরও কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়। আর সেই কারণেই মাঠে তিনি নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে খেলতে পারেন।

বিখ্যাত একটি পডকাস্টে হালান্ড নিজেই তার এই অদ্ভুত অভ্যাসের কথা প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে ফাঁস করেন। ঘুমানোর সময় মুখে বিশেষ টেপ লাগিয়ে মুখ বন্ধ রাখাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'মাউথ টেপিং'। হালান্ডের মতে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঘুমানোর সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া বন্ধ করা এবং শরীরকে বাধ্য করা যাতে সেটি কেবল নাক দিয়ে শ্বাস নেয়।

হালান্ড মনে করেন, পৃথিবীতে পারফরম্যান্স ভালো রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুম, আর ভালো ও গভীর ঘুমের জন্য নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। আর এই কারণেই তিনি ঘুমানোর আগে নিজের মুখ টেপ দিয়ে আটকে নেওয়ার এই কৌশলটি বেছে নেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং স্পোর্টস সায়েন্সও হালান্ডের এই দাবির পক্ষে কথা বলে। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেয়ে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার উপকারিতা অনেক বেশি। নাক দিয়ে শ্বাস নিলে ফুসফুস অনেক বেশি কার্যকরভাবে অক্সিজেন শোষণ করতে পারে, যা রক্তের অক্সিজেন প্রবাহকে উন্নত করে। হালান্ডের মতো হাই-প্রোফাইল অ্যাথলেটের মাঠে দীর্ঘ সময় ধরে অবিরাম দৌড়ানোর জন্য যে স্ট্যামিনা বা দমের প্রয়োজন হয়, তা ধরে রাখতে এই অভ্যাস সরাসরি সাহায্য করে। তাছাড়া মুখ বন্ধ থাকলে নাক ডাকার সমস্যা দূর হয়, মুখ বা গলা শুকিয়ে যায় না এবং ঘুম অনেক গভীর হয়। একজন ফুটবলারের জন্য কঠোর পরিশ্রমের পর দ্রুত শরীরের ক্লান্তি দূর করতে এই গভীর ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।

তবে হালান্ড কেবল মুখে টেপ দিয়েই ক্ষান্ত হন না, নিখুঁত ঘুমের জন্য তিনি আরও কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলেন। আইটিভি নিউজের রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, ঘুমানোর ঠিক তিন ঘণ্টা আগে থেকেই তিনি এক বিশেষ ধরনের চশমা পরেন, যা মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির ক্ষতিকর ব্লু-লাইট আটকে দেয়। এছাড়া তার শোবার ঘরে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা ওয়াই-ফাই সিগন্যাল থাকে না, যাতে একদম শতভাগ প্রাকৃতিক, ঠান্ডা ও অন্ধকার পরিবেশে তার শরীর বিশ্রাম পায়।

হলান্ড শুধু শারীরিক গঠনেই অন্যদের চেয়ে আলাদা নন, তার জীবনযাপনের ধরনও বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো শর্টকাট নেই, নেই কোনো জাদুকরি কৌশল। প্রতিদিন শুধু কিছু মৌলিক নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার এই অতিমানবীয় ফিটনেস।

আধুনিক যুগের ফুটবলাররা যেখানে মেপে মেপে ক্যালরি হিসাব করে দামি সব সাপ্লিমেন্ট খান, হলান্ড সেখানে ভরসা রাখেন আদিম মানবের খাদ্যাভ্যাসে। তার প্রতিদিনের ডায়েটের মূল উপাদান গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজা।

পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় এসব সত্যিকারের ‘সুপারফুড’। পেশি গঠনে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি, আয়রন ও খনিজ উপাদানে ঠাসা থাকে এই অঙ্গগুলো।

পাশাপাশি হলান্ড খান ঘাস খেয়ে বড় হওয়া গরুর টমাহক স্টেক, সাওয়ারডো রুটির সঙ্গে ডিম আর একদম খাঁটি মধু। তার খাবারের তালিকায় প্রক্রিয়াজাত কোনো উপাদানের জায়গা নেই। প্রকৃতির সবচেয়ে খাঁটি খাবারগুলোই তার শক্তির মূল উৎস।

ম্যানচেস্টারের আকাশ বেশির ভাগ সময়ই মেঘলা থাকে। কিন্তু হলান্ডের দিন শুরু হয় প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই অন্তত ১০ মিনিটের জন্য বাইরে হাঁটতে বের হন, ভোরের মিষ্টি রোদ সরাসরি চোখে লাগান।

এটা তার শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা প্রাকৃতিক ঘড়িকে সচল রাখে। যেদিন ম্যানচেস্টারের আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না, সেদিন তিনি রেড লাইট প্যানেলের সামনে দাঁড়ান। এই লাল আলো তার শরীরের কোষগুলোয় শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।

মাঠে ৯০ মিনিট দৌড়ানোর পর শরীরের যে ক্ষতি হয়, তা দ্রুত সারিয়ে তোলাটাই একজন অ্যাথলেটের আসল পরীক্ষা। হলান্ড সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন বরফ-ঠান্ডা পানির বাথটাবে নামেন এবং সনায় যান। সনা এমন এক ঘর, যেখানে খুব গরম ও শুষ্ক পরিবেশ তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত কাঠের ঘর হয় এবং ভেতরের তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৭০–১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

হলান্ড এই সনায় কিছু সময় বসে ঘাম ঝরান। তারপর গোসল করেন ঠান্ডা পানি দিয়ে। এই পদ্ধতিতে তাঁর পেশির ক্লান্তি দূর করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে।

এর বাইরে প্রতিদিন নিয়ম করে ২০ মিনিট হিপ ফ্লেক্সর, গ্রোইন ও হ্যামস্ট্রিংয়ের স্ট্রেচিং বা ফ্লেক্সিবিলিটির জন্য কাজ করেন। এমনকি হালকা অনুশীলনের সময়ও কড়াভাবে খেয়াল রাখেন যেন শ্বাসপ্রশ্বাস শুধু নাক দিয়েই চলে।

হলান্ডের এই রুটিন দেখলে মনে হবে, তিনি যেন কোনো এক প্রাচীন ভাইকিং যোদ্ধা, যিনি ভুল করে আধুনিক যুগে চলে এসেছেন! প্রক্রিয়াজাত খাবার বা কৃত্রিম আলোর এই আধুনিক দুনিয়ায় তিনি জীবনযাপন করছেন একেবারে আদিম ও প্রাকৃতিক নিয়মে।

প্রতিদিনের এমন ছোট ছোট অভ্যাস, কঠোর শৃঙ্খলা আর নিজের শরীরের প্রতি অবিচল যত্নই আরলিং হালান্ডকে গড়ে তুলেছে আজকের বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারে। তাঁর প্রতিটি অভ্যাসের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—নিজেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখার এই নিষ্ঠাই তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর ও দুর্দান্ত অ্যাথলেটে পরিণত করেছে।

সূত্র: রয়টার্স

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #আরলিং হালান্ড #নরওয়ে #বিশ্বকাপ #ফুটবল