বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে বাজানো প্রতিটি গান আগে থেকেই পরিকল্পিত। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার রয়েছে একটি বিশেষ স্টেডিয়াম বিনোদন দল, যারা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ফুটবল সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বিশাল একটি সংগীতভাণ্ডার তৈরি করে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকায় রয়েছে সাত শত পঞ্চাশেরও বেশি গান।
এই প্লেলিস্টে থাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় স্টেডিয়াম সংগীতের পাশাপাশি প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী গান। প্রতিটি দলের জন্য আলাদা লাইনআপ ঘোষণার গান, ওয়ার্ম-আপ সংগীত এবং গোল উদযাপনের গান নির্ধারিত থাকে। ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলের সমর্থকদের জন্যও বিশেষ গান বাজানো হয়, যাতে পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে পারে।
বিশ্বকাপে এখন আটচল্লিশটি দেশ অংশ নিচ্ছে। ফলে এই সংগীত তালিকাও হয়ে উঠেছে এক অনন্য বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।
তবে কিছু গান সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় সব স্টেডিয়ামেরই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের ‘সেভেন নেশন আর্মি’, এসি/ডিসির ‘থান্ডারস্ট্রাক’, কিংবা গালার নব্বই দশকের ইউরোড্যান্স হিট ‘ফ্রিড ফ্রম ডিজায়ার’—বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া আসরে সমান জনপ্রিয়।
‘উই লুজ এভরি উইক: দ্য হিস্ট্রি অব ফুটবল চ্যান্টিং’–এর লেখক অ্যান্ড্রু লন মনে করেন, যেসব গান সহজে গাওয়া যায়, দ্রুত মনে থাকে এবং সমর্থকদের মধ্যে আনন্দ ছড়ায়, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়ামের চিরচেনা সংগীতে পরিণত হয়।
তার মতে, শুধু সুর নয়, একটি গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিও তার জনপ্রিয়তার বড় কারণ।
লনের ভাষায়, কোনো একটি বিশেষ মুহূর্ত যদি কোনো গানের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে সেই আবেগই গানটিকে অমর করে দেয়।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ নিল ডায়মন্ডের ‘সুইট ক্যারোলাইন’। বহু বছর ধরেই এটি বিভিন্ন খেলায় ব্যবহৃত হলেও, কোভিড-উত্তর সময়ে ইংল্যান্ডের সমর্থকদের কাছে গানটি নতুন অর্থ পায়। দীর্ঘ লকডাউন শেষে ‘হাত বাড়িয়ে আমাকে ছোঁয়া, তোমাকে ছোঁয়া’—এই লাইনগুলো নতুন আবেগ সৃষ্টি করে, আর সেখান থেকেই গানটি ইংলিশ ফুটবলের এক প্রতীকে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ফুটে ওঠে তাদের নির্বাচিত সংগীতে।
আর্জেন্টিনা ওয়ার্ম-আপ এবং গোল উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছে লস ফ্যাবুলোসোস ক্যাডিলাকসের ‘এল মাতাদোর’। নামের অর্থ ‘ঘাতক’ হওয়ায় অনেকে মনে করেন এটি যেন লিওনেল মেসির গোল করার দক্ষতার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে গানটি রচিত হয়েছিল উনিশশো সত্তরের দশকের লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রেক্ষাপটে।

ঘানা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছে ডোপনেশনের ‘কাকালিকা’ দিয়ে। দুই হাজার পঁচিশ সালের এই জনপ্রিয় নাচের গানটিকে এর নির্মাতারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগীতধারা এবং বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার মূল বার্তা বৈচিত্র্যকে উদযাপন করা।
মেক্সিকো আবার বেছে নিয়েছে কিংবদন্তি লোকসংগীত দল মারিয়াচি ভার্গাসের তিনটি আলাদা সংগীত। আঠারোশো সাতানব্বই সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যান্ড আজও দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্লেলিস্টে রয়েছে ব্ল্যাকপিঙ্ক ও বিটিএসের জনপ্রিয় কে-পপ গান।
ফ্রান্স গোল করলে স্টেডিয়ামে বাজে ডাফট পাঙ্কের ‘ওয়ান মোর টাইম’। কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলের পর এই গানের সঙ্গে হাজারো সমর্থকের কণ্ঠ মিলিয়ে ওঠা যেন এক অন্যরকম উৎসব।
অস্ট্রেলিয়া নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে মেন অ্যাট ওয়ার্কের ‘ডাউন আন্ডার’ দিয়ে, আর বেলজিয়ামের ওয়ার্ম-আপে বাজে টেকনোট্রনিকের ‘পাম্প আপ দ্য জ্যাম’।
মজার বিষয় হলো, টুর্নামেন্ট চলাকালেও কখনো কখনো দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে গান বদলে যায়।
দুই হাজার ছাব্বিশ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের চার–দুই গোলের জয়ের পর সমর্থকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওয়েসিসের ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ গাইতে শুরু করেন। সেই মুহূর্ত এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে গানটি পরে ইংল্যান্ডের নিয়মিত বিজয় সংগীতে পরিণত হয়।
অধিনায়ক হ্যারি কেইন পরে দলের অনুষ্ঠান ‘লায়ন্স ডেন’–এ বলেন, স্টেডিয়ামে হাজারো মানুষ একসঙ্গে ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ গাইছিল—এটাই ছিল ইংল্যান্ডের জার্সিতে তার সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
তার ভাষায়, “আমাদের সঙ্গে সমর্থকদের সেই সংযোগ আজও আছে। কিন্তু পুরো স্টেডিয়াম যখন একসঙ্গে ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ গেয়েছিল, সেটি সত্যিই অসাধারণ এক মুহূর্ত ছিল।”
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে জন ডেনভারের ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’। আগে তাদের একমাত্র পরিচিত স্লোগান ছিল ‘ইউএসএ, ইউএসএ’, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সমালোচনারও মুখে পড়েছিল।
অ্যান্ড্রু লনের মতে, মার্কিন ফুটবল সংস্কৃতি এখনও বিকাশের পথে। তাই নতুন সংগীত গ্রহণের এই প্রক্রিয়া কিছুটা কৃত্রিম মনে হতে পারে। তবে যদি এটি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকে, তাহলে একসময় সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যাবে।
তার কথায়, “আজ যা নতুন মনে হচ্ছে, সেটাই যদি ত্রিশ বছর পরও স্টেডিয়ামে গাওয়া হয়, তখনই সেটি সত্যিকারের ফুটবল সংস্কৃতিতে পরিণত হবে।”
বিশ্বকাপ তাই শুধু গোল, ট্রফি আর জয়ের গল্প নয়। প্রতিটি গান, প্রতিটি সুর, প্রতিটি কোরাসও হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। অনেক সময় একটি ম্যাচের স্কোর ভুলে যায় মানুষ, কিন্তু স্টেডিয়ামজুড়ে একসঙ্গে গাওয়া একটি গান থেকে যায় আজীবন।
এসি//