মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রসঙ্গ টেনে যুদ্ধবিরতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, “সেই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি মানে হলো একটু কম মাত্রায় গুলি চালানো।”
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে একজন সাংবাদিক যখন ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সংজ্ঞা জানতে চান, তখন ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির নিয়মকানুনকে অগ্রাহ্য করে একটি নিজস্ব সংজ্ঞা দেন। মুচকি হেসে তিনি বলেন, "বিশ্বের ওই অংশে, যুদ্ধবিরতি হলো যখন আপনি আরও সংযতভাবে গুলি চালান।"
ওভাল অফিসে দেয়া ওই মন্তব্যের সময় তার পেছনে থাকা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হাসতে দেখা যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই এটিকে “মজার ও সঠিক মন্তব্য” বলে প্রতিক্রিয়া জানান।
একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, "হাহা, এর চেয়ে সঠিক কথা আমি আর শুনিনি।" আরেকজন যোগ করেছেন: "তিনি ভুল বলেননি, মধ্যপ্রাচ্যটাই আসলে অন্যরকম।"
সমালোচকদের মতে, পশ্চিমা দর্শকদের কাছে এটি কেন হাস্যকর মনে হয়, তা বোঝার জন্য প্রাচ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় ধারণা হলো—মধ্যপ্রাচ্যকে স্বভাবগতভাবে বর্বর এবং জন্মগতভাবে রক্তপিপাসু একটি অঞ্চল হিসেবে দেখা।
এটি মূলত একটি গভীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করে—যেখানে ধরে নেয়া হয়, প্রাচ্যের মানুষ স্বভাবতই যুদ্ধপ্রবণ এবং তারা জীবনের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম দেয়।
তারা আরও উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিদেশি হস্তক্ষেপ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উপনিবেশিক ইতিহাস এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এসব কারণে অঞ্চলটি বারবার যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়েছে।
সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্যের আরেকটি সমস্যা হলো মানবিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, যদি যুক্তরাষ্ট্রে কোনো স্কুলে ভয়াবহ গুলির ঘটনার পর কোনো রাজনীতিবিদ বলেন, “আমেরিকায় বন্দুক নিয়ন্ত্রণ মানে হলো একটু কম মাত্রায় শিশুদের হত্যা করা”—তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র ক্ষোভ, সমালোচনা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি অনেক সময় হালকা মন্তব্য বা ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সমালোচকরা।
পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে যখন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে “স্বল্প-তীব্রতার সংঘাত” হিসেবে দেখা হয়, তখন তা এক ধরনের মানসিকতা তৈরি করে যা প্রকৃত ন্যায়বিচারের প্রয়োজনকে আড়াল করে। এর ফলে এমন ধারণা দাঁড়ায় যে, আরব শিশুদের নিরাপত্তা বা স্থায়ী শান্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেবল “নিয়ন্ত্রিত” মাত্রায় সহিংসতা। যে যুদ্ধবিরতিতে এখনো গোলার শব্দ থাকে, সেটিকে শান্তি বলা যায় না। একইভাবে, একটি পুরো অঞ্চলকে সাইরেনের শব্দে অভ্যস্ত বলে ধরে নেয়াও বাস্তবতার বিকৃতি বলে জানিয়েছেন সমালোচকরা।
ওভাল অফিসে সাম্প্রতিক এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের হাসির ঘটনা নিয়ে সমালোচকেরা বলছেন, এটি কেবল সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। তাদের মতে, এই প্রতিক্রিয়া এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বিশ্বকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়—কার জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কার মৃত্যু শোকের বিষয়, আর কার জীবনকে কেবল রসিকতার উপাদান হিসেবে দেখা হয়।
এসি//