ধর্ষণের মতো ভয়ংকর ও ঘৃণিত অপরাধের শাস্তি নিয়ে ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে নানা কঠোর বিধানের গল্প। আধুনিক যুগে যেখানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির প্রচলন দেখা যায়, সেখানে প্রাচীন সমাজে অপরাধীদের মনে ভয় সঞ্চার করতে ব্যবহার করা হতো আরও নির্মম ও বেদনাদায়ক পদ্ধতি। সেইসব শাস্তির মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এক পদ্ধতি ছিল—জ্যান্ত অবস্থায় শূলে চড়ানো।
ইতিহাস বলছে, এই শাস্তির নাম শুনলেই যে চরিত্রটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে, তিনি ১৫শ শতাব্দীর ওয়ালাচিয়ার শাসক ভ্লাদ তৃতীয়। বর্তমান রোমানিয়ার এই অঞ্চল শাসন করতেন তিনি। নিষ্ঠুরতার জন্য ইতিহাসে তিনি পরিচিত হয়ে আছেন ‘ভ্লাদ দ্য ইমপেলার’ নামে, আর অনেকের কাছে তিনি আরও বেশি পরিচিত ‘ড্রাকুলা’ নামেই।
রালফ ফ্লোরেসকা এবং রেমন্ড ম্যাকনালির লেখা বিখ্যাত ইতিহাসভিত্তিক বই ‘ড্রাকুলা, প্রিন্স অব ম্যানি ফেসেস’ এবং সমসাময়িক রোমানিয়ান লোককথা থেকে তার শাসনকালের বিস্তারিত জানা যায়। ভ্লাদ তার রাজ্যে অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজ্যে চুরি, ডাকাতি, খুন এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শাস্তি ছিল অবধারিতভাবে শূলে চড়ানো।
ঐতিহাসিকদের মতে, ভ্লাদ বিশ্বাস করতেন যে, কেবল চরম নিষ্ঠুরতার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব।
লোককথায় বলা হয়, তার শাসনামলে রাস্তাঘাটে স্বর্ণমুদ্রা পড়ে থাকলেও চুরির ভয়ে কেউ তা স্পর্শ করত না এবং নারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারত, কারণ সবাই জানত ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি হলো জ্যান্ত শূলে চড়ানো।
এই শাস্তির নির্মমতা ছিল কল্পনাতীত। অপরাধীকে একটি দীর্ঘ, ধারালো কাঠের বা লোহার দণ্ডের ওপর জ্যান্ত অবস্থায় গেঁথে দেওয়া হতো। দণ্ডটি শরীরের নিচের দিক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে এমনভাবে বুক, ঘাড় বা মুখ দিয়ে বের করা হতো, যাতে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (যেমন হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুস) সরাসরি বা খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এর ফলে অপরাধী তাৎক্ষণিকভাবে মারা যেত না। জনসমক্ষে খোলা ময়দানে বা রাস্তার পাশে তাকে ওই অবস্থায় খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। মৃত্যু নিশ্চিত হতে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগত। এই নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করে তিলে তিলে মৃত্যু হতো ধর্ষকের।
ভ্লাদের আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, বিশেষ করে প্রাচীন অ্যাসিরীয় সভ্যতায় (খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দী) শূলে চড়ানোর প্রচলন ছিল। প্রাচীন ব্যাবিলনের বিখ্যাত ‘হাম্মুরাবির কোড’-এ কুমারী ধর্ষণের জন্য সাধারণত নদীতে ডুবিয়ে হত্যার বিধান ছিল।
তবে পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পাশাপাশি চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং পাশবিক যৌন অপরাধের জন্য জনসমক্ষে শূলে চড়ানোর নজির পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্যেও চরম অপরাধের ক্ষেত্রে এই শাস্তির বিধান ছিল। মধ্যযুগের ইউরোপে সামন্তবাদীরা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং সমাজে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে অপরাধ দমনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করত।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে শাসকদের এক ধরনের বিশ্বাস ছিল—অপরাধীকে যদি জনসমক্ষে ভয়ংকর ও নির্মম শাস্তি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়, তবে তা অন্যদের জন্য স্থায়ী সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। সেই সময় মানবাধিকারের আধুনিক ধারণা তখনো গড়ে ওঠেনি, ফলে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রেও কঠোর ও অনেক সময় নিষ্ঠুর শাস্তিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হতো। সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এসব শাস্তিকে ন্যায়বিচারের অংশ বলেই মেনে নিত।