জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। তবে একটি বড় প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই চালকদের মনে শঙ্কা তৈরি করেছে—দীর্ঘ পথে ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গেলে কী হবে? চার্জিং স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত অবকাঠামো এবং ‘রেঞ্জ অ্যাংজাইটি’ বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্তারে বড় বাধা হিসেবে ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির নতুন অগ্রযাত্রা সেই বাস্তবতাকেই বদলে দিতে শুরু করেছে। এখন আর শুধু চার্জিং স্টেশনে নয়, চলন্ত গাড়ি সরাসরি রাস্তা থেকেই চার্জ নিচ্ছে—যা একসময় কল্পবিজ্ঞানের অংশ মনে হলেও ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ‘ওয়্যারলেস চার্জিং সড়ক’ বা ‘ইলেকট্রিক রোড সিস্টেম’ (ইআরএস) নিয়ে বড় পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। স্মার্টফোনের ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তির মতোই এই ব্যবস্থায় রাস্তার পিচের নিচে বিশেষ কপার কয়েল বসানো হয়, যা বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ‘ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স’ প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব কয়েল চলন্ত গাড়ির ব্যাটারিতে তারবিহীনভাবে শক্তি সরবরাহ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিরাপদ, কার্যকর এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ফ্রান্সের প্যারিস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট—বিশ্বের ব্যস্ত হাইওয়েগুলো ধীরে ধীরে ‘স্মার্ট এনার্জি করিডোরে’ রূপ নিচ্ছে। সুইডেন এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দেশটি ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে তাদের ই২০ মোটরওয়েকে বিশ্বের প্রথম স্থায়ী চার্জিং সড়কে পরিণত করতে চায়। শুধু তাই নয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সড়ক বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে তারা।
ফ্রান্সের প্যারিসে এ১০ হাইওয়েতে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চার্জিং সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। জার্মানিতে বাণিজ্যিক বাস রুটে এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকায় ডেট্রয়েটে ইতোমধ্যে প্রথম পাবলিক ওয়্যারলেস চার্জিং সড়ক চালু হয়েছে। পাশাপাশি ইন্ডিয়ানা ও পেনসিলভেনিয়ায়ও পাইলট প্রকল্প এগোচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তাদের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার দেখিয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ায় চীন হাইওয়েতে সৌরশক্তিনির্ভর চার্জিং অবকাঠামো নিয়ে কাজ করছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া উন্নত করছে তাদের ‘অনলাইন ইলেকট্রিক ভেহিকল’ (ওএলইভি) প্রযুক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি সফলভাবে বিস্তৃত হলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির আকার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে। এর ফলে গাড়ির ওজন কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির কাছাকাছি বা আরও কমে আসতে পারে।
বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাক, বাস এবং গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ দূরত্বে মালবাহী যানবাহনকে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চার্জিং স্টেশনে অপেক্ষা করতে হবে না। এতে লজিস্টিক খরচ কমবে, পরিবহন দক্ষতা বাড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটিতে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়েই বাস, ট্যাক্সি বা চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ নিতে পারবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জও। ওয়্যারলেস চার্জিং সড়ক নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল; প্রতি কিলোমিটার বিদ্যুতায়নে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্যের কারণে এখনো কোনো একক বৈশ্বিক মানদণ্ড গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক যানবাহন একযোগে চার্জ নিলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। রাস্তার নিচে বসানো প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণও জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ।
বাংলাদেশও ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রাথমিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পথে হাঁটছে। দেশে কিছু চার্জিং স্টেশন চালু হলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো, ব্যবহারকারী সংখ্যা এবং নীতিগত সমন্বয়ের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে যখন বিশ্ব চলন্ত সড়ককে চার্জিং ব্যবস্থায় রূপান্তরের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রথম ধাপই হলো শক্তিশালী মৌলিক চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
সব মিলিয়ে, চলন্ত রাস্তায় চার্জ নেয়ার প্রযুক্তি শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির সীমাবদ্ধতাই দূর করছে না—এটি ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও বুদ্ধিমান, টেকসই এবং নিরবচ্ছিন্ন করার এক নতুন দিগন্তও খুলে দিচ্ছে।
এসি//