আন্তর্জাতিক

ইরানের ভয়ে দুবাই ছাড়তে ধনকুবেরদের হুড়োহুড়ি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিমান হামলা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা এবং পরবর্তী বিমানবন্দর কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় সেখানে অবস্থানরত পর্যটক ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বিপাকে পড়েছেন। পরিস্থিতির কারণে অনেকেই বিকল্প পথে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন, ফলে প্রাইভেট জেটের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং ভাড়াও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা সামরিক অভিযান চলছে। এ অভিযানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল–এর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দুবাইসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সংঘাতের প্রভাবে দুবাই বিমানবন্দরের কার্যক্রম আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং শহরের কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির কারণে দুবাই ছাড়তে ইচ্ছুক ধনকুবের, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও পর্যটকদের অনেকে ব্যক্তিগত জেটের ওপর নির্ভর করছেন। তবে চাহিদার তুলনায় উড়োজাহাজের সংখ্যা কম থাকায় প্রাইভেট ফ্লাইটের ভাড়া দ্রুত বেড়ে গেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান–এর বরাতে জানা গেছে, মাসকাট থেকে ইউরোপগামী ছোট আকারের একটি প্রাইভেট জেটের ভাড়া এখন প্রায় ৮৫ হাজার ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকার সমান এবং স্বাভাবিক সময়ের প্রায় তিন গুণ বেশি। একইভাবে মস্কোগামী চার্টার বিমানের প্রতিটি আসনের ভাড়া প্রায় ২০ হাজার ইউরো বা ২৮ লাখ টাকার বেশি।

অন্যদিকে অনেক চার্টার বিমান কোম্পানি নিরাপত্তা ও বীমা জটিলতার কারণে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে। অস্ট্রিয়াভিত্তিক চার্টার প্রতিষ্ঠান অ্যালবাট্রস জেট জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের কাছে খুব সীমিত সংখ্যক উড়োজাহাজ খালি রয়েছে। ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়া প্রায় ৯০ হাজার ইউরো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

দুবাই ছাড়তে ইচ্ছুক অনেক যাত্রী প্রায় ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে রিয়াদ–এ যাচ্ছেন, কারণ সেখানকার বিমানবন্দর এখনো সচল রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফোর জানিয়েছে, কিছু বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা গ্রাহকদের এসইউভি গাড়ির বহর ভাড়া দিয়ে প্রথমে রিয়াদে পৌঁছে দিচ্ছে, এরপর সেখান থেকে প্রাইভেট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করছে।

প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ভিমানা প্রাইভেট জেটসের প্রধান নির্বাহী আমির ন্যারান বলেন, রিয়াদ থেকে ইউরোপগামী ফ্লাইটের ভাড়া বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা প্রায় ৪ কোটি টাকার বেশি।

সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো সরকারি উড়োজাহাজে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন, যা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তখনও শত শত ইতালীয় নাগরিক দুবাইয়ে আটকে ছিলেন।

ক্রোসেতো জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিমানের খরচ বহন করেছেন এবং বর্তমানে সরকারি দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দিচ্ছেন। যদিও বিরোধী দলগুলো প্রশ্ন তুলেছে কেন সরকার আগেই নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেনি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।

দুবাইয়ে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষ হোটেলগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। যেসব পর্যটক ফ্লাইট জটিলতার কারণে দেশ ছাড়তে পারছেন না, তাঁদের হোটেল থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগের ভাড়াতেই থাকার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু রুশ পর্যটক অভিযোগ করেছেন যে তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে বলা হচ্ছে অথবা রিসোর্ট ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

ভিডিওবার্তায় একজন রুশ নারী বলেন, তাঁদের হোটেল কর্তৃপক্ষ বুকিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে এবং বিষয়টি নিজেদের দায়িত্ব নয় বলে জানিয়েছে, যা অনেক পর্যটকের জন্য অমানবিক আচরণ হিসেবে মনে হচ্ছে।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে বন্দর কার্যক্রমও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার পশ্চিমা পর্যটক মাঝসমুদ্রে নোঙর করা প্রমোদতরিতে আটকা পড়েছেন। নিরাপত্তার কারণে যাত্রীদের জাহাজ থেকে নামতে দেওয়া হচ্ছে না এবং অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের কেবিনে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে দুবাই ও শারজার শিল্পাঞ্চল এবং আবুধাবি–এর জায়েদ বন্দরে হামলার পর বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলির ছবি প্রকাশ পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকার ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, আবুধাবি থেকে অন্তত একটি যাত্রীবাহী বিমান লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে, তবে ফ্লাইট কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তি এখনো রয়ে গেছে।

দুবাইয়ে অবস্থানরত অনেক মানুষ সম্ভাব্য নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথম দলটি ওমান সীমান্তের দিকে ছুটছে, দ্বিতীয় দলটি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন এলাকায় সময় কাটাচ্ছে, আর তৃতীয় দলটি সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

 

এসি//

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #ইরান #দুবাই #হামলা #ধনকুবের