জাতীয়

‘গুম বন্ধ হলেও চলছে গণগ্রেপ্তার ও জামিন না দেয়ার চর্চা’

বায়ান্ন প্রতিবেদন

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে যে ভয়, গুম ও দমন–পীড়নের পরিবেশ বিরাজ করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়ে কিছুটা হ্রাস পেলেও মব, গণগ্রেপ্তার এবং জামিন না দেয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ক্ষমতা নেয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঘোষিত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজারো মানুষকে নির্বিচারভাবে আটক করার অভিযোগও রয়েছে।

এইচআরডব্লিউ উল্লেখ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও বিভিন্ন সহিংস গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী অধিকার ও এলজিবিটিবিরোধী গোষ্ঠীর সহিংসতা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

গণগ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যু

এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার গ্রেপ্তার এখনও অব্যাহত রয়েছে। কয়েকশো ব্যক্তিকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দী রয়েছেন। বিচার ছাড়াই জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হচ্ছে। এ তালিকায় অভিনেতা, গায়ক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন।

গত বছরের ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আরও অনেকে আটক হতে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এছাড়া, ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন এবং ৮ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনে মারা গেছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত এবং ৮১ জন নিহত হয়েছেন।

মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। দলটির সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা এবং অনলাইনে সমর্থনমূলক বক্তব্য প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেয়ার অভিযোগে লেখক ও সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আদালত ফৌজদারি কার্যক্রম চালিয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা আইনও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ সৃষ্টি করছে। মার্চে আইনের ৯টি ধারা বাতিল হলেও কিছু বিধান এখনও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচার

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকারের সময় আন্দোলন দমন করার ঘটনায় পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। তবে দায়ীদের জবাবদিহির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি সীমিত। জুলাইয়ে মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করা হলেও ট্রাইব্যুনালের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আইন সংশোধনের কিছু উন্নতি হলেও মৃত্যুদণ্ড এবং রাজনৈতিক সংগঠন বিলুপ্ত করার ক্ষমতা এখনও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংস্কার কার্যক্রমে স্থবিরতা

এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, শ্রম ও নারী অধিকারসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করলেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে খুব কম সংস্কার বাস্তবায়িত হয়েছে।

সংস্কার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি সীমিত থাকায় নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে মানবিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #হিউম্যান রাইটস ওয়াচ #শেখ হাসিনা #গুম #গণগ্রেপ্তার #অন্তর্বর্তী সরকার