জাতীয়

আজ ৫ আগস্ট: কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

ছবি: সংগৃহীত ফাইল ছবি

আজ ৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার টানা আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা প্রায় ১৫ বছর ৭ মাসের শাসনের অবসান ঘটে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যেই রূপ শেষ পর্যন্ত তৈরি করে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পথ।

২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে জুলাইয়ের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের মূল দাবি ছিলো কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমুক্ত ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।

শুরুর দিকে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। প্রতিবাদে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর পরপরই আন্দোলন দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

সহিংসতা বাড়তে থাকায় সরকার দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। আবাসিক হলগুলো খালি করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

১৮ জুলাই রাত থেকে সারা দেশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন ইন্টারনেট প্রায় পাঁচদিন বন্ধ ছিল। একই সময়ে কয়েক দফায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও বন্ধ বা সীমিত করা হয়। ফলে দেশ কার্যত ডিজিটালভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ব্যাপক প্রভাব পড়ে যোগাযোগ, ব্যাংকিং, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবায়। 

১৯ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। ১৯ জুলাই দিনশেষে রাত ১২টার পর থেকে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তবে কারফিউ উপেক্ষা করেই বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করতে থাকে আন্দোলনকারীরা। 

২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে একদল লোক ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম ও আবু বাকের মজুমদারকে বিকেলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের নেওয়া হয় ডিবি অফিসে। 

গভীর রাতে ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে জানান, ‘নিরাপত্তা ও সহিংসতার তথ্য জানার স্বার্থে’ তাদের ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে।

ডিবি হেফাজতে রেখে তাদের দিয়ে আন্দোলন স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করানো হয়। তবে পরে মুক্তি পাওয়ার পর তারা জানান, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে।

এদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নেতৃত্বে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অভিভাবক, পেশাজীবী, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে। এক পর্যায়ে এটি ছাত্র আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে গণআন্দোলনে পরিণত হয়।

জুলাইয়ের দ্বিতীয়ার্ধে আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে। দেশজুড়ে সংঘর্ষ, গুলি, গণগ্রেপ্তার এবং বলপ্রয়োগ করতে থাকে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, সাধারণ নাগরিক ও শিশুও ছিল। এছাড়া হাজার হাজার মানুষ আহত হন এবং গ্রেপ্তার করা হয় বিপুলসংখ্যক মানুষকে। প্রতিবেদনে আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ তুলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। 

জুলাইয়ের শেষদিকে আন্দোলনের লক্ষ্য বদলে যায়। কোটা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।  

 

৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘এক দফা’ ঘোষণা করে। তাদের মূল দাবি ছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগ। ৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে আবারো সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

পরদিন ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীর দিকে রওয়ানা হন। ক্রমবর্ধমান জনচাপ ও দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন।

একই দিন বিকেল ৩টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগের কথা জানান।

৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। বঙ্গভবনের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এরপর ৮ আগস্ট নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। একই সঙ্গে আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ এবং পরবর্তী জবাবদিহির প্রশ্নও দেশের রাজনীতি ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

আজ ৫ আগস্ট, সেই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি, আলোচনা সভা ও স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে। 

 

এমএ//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস #৫ আগস্ট