২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। টানা কয়েক সপ্তাহের আন্দোলন,সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই দিনেই দেশ ঘটে এক নাটকীয় পরিবর্তন। যেই পরিবর্তনের ছোয়ায় পালাবদল হয় দেশের ক্ষমতার। অনেকের কাছে এটি গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের দিন। আবার অন্যদের কাছে এটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের প্রতীক।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিলো সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে। ২০২৪ এর ৫ জুন বাংলাদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার রায় দেয় হাইকোর্ট। এ রায়ে সরকারি নিয়োগের দুই শ্রেণিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেটি অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে উচ্চ আদালত। এ রায়ের পরেই ঢাকায় প্রতিবাদ জানায় চাকরি প্রার্থীরা।
জুলাই মাসজুড়ে সেই আন্দোলন দানা বাঁধে। শাহবাগ ব্লকেড থেকে সেই কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জেলাগুলোতে। ১৬ জুলাই আন্দোলনে নিহত হন বেরোবি শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। মুহুর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক যোগে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্র-জনতার সেই আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারবিরোধী নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি। আন্দোলন পরিনত হয় ছাত্র-জনতার বৃহত্তর গণআন্দোলনে। আন্দোলনে দমনে ১৮ জুলাই কারফিউ জারি করে ইন্টারনেট বন্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার।
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক দফা দাবিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের আহ্বান জানান আন্দোলনকারিরা। ঘোষণা আসে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। কারফিউ, ব্যারিকেড ও কড়া নিরাপত্তা উপেক্ষা করে রাজধানীমুখী হতে থাকেন লাখো মানুষ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ সেই আন্দোলনে যোগ দেয়।
ঢাকার শাহবাগ, ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। আন্দোলনের চাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। পরে সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি দেশের সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে সংকট কাটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উল্লাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। অনেক স্থানে সরকারি স্থাপনা ও রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
তবে বিজয়ের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি দিনটি ছিল বেদনায়ও ভরা। বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় আরও হতাহতের খবর আসে। জুলাই-আগস্টজুড়ে সহিংসতায় বহু মানুষের প্রাণহানি এবং হাজারো মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা দেশকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এসব ঘটনার বিচার, জবাবদিহি এবং প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে এখনো আলোচনা সমলোচনা চলছে।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন, বিচার ও প্রশাসনিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
আজও ৫ আগস্ট স্মরণ করা হয় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। কেউ দিনটিকে গণঅভ্যুত্থানের বিজয় হিসেবে দেখেন, আবার কেউ রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি দিন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।