ধরলা নদীতে নৌকা বাইচ উপভোগ করলো লাখো দর্শনার্থী
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ধরলা নদীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উপভোগ করেছেন লাখো দর্শনার্থী। স্থানীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত এ নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় গত ২৬ আগস্ট। এতে স্থানীয়সহ বিভিন্ন এলাকার মোট ১২টি বাইচের নৌকা অংশ নেন। এরপর নির্ধারিত দিনগুলোতে ধরলা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্ব। সেমিফাইনাল শেষে শুক্রবার বিকালে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত নৌকা বাইচের ফাইনাল খেলা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ফুলবাড়ী ধরলা সেতুর উত্তরে আয়োজিত ফাইনাল খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী।
ফাইনাল খেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে উলিপুর থেকে আসা ‘তামিম বাংলা’। দ্বিতীয় হয় ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের হক বাজার এলাকার ‘আশার আলো ভার্সন-১’ এবং তৃতীয় হয় নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার ‘দাদাভাই’ নামের নৌকা।
ফাইনাল খেলা দেখতে ধরলা নদীর দুই পাড়ে নামে মানুষের ঢল। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় আবার কেউ আশপাশের উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়ে উপভোগ করেন নৌকা বাইচ।
নৌকা বাইচ শুরু হওয়ার পর দর্শনার্থীদের করতালি, চিৎকার ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো ধরলা পাড়। প্রতিযোগী নৌকাগুলো ঢেউ কেটে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা।

স্থানীয়রা জানান, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার বহু পুরোনো ঐতিহ্য। একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এ ধরনের আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। তাই ধরলা নদীতে এমন আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
আয়োজকরা জানান, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং মানুষের মাঝে নির্মল আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
নৌকা বাইচকে ঘিরে ধরলা নদীর পাড়ে বসে ছোট-বড় নানা ধরনের দোকানপাট। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বাড়তি বেচাকেনার সুযোগ পান। সব মিলিয়ে নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীর ধরলা পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
লালমনিরহাট সদর থেকে পরিবার নিয়ে নৌকা বাইচ দেখতে আসা ডাক্তার খগেন্দ্র নাথ বর্মন বলেন, “সেমিফাইনালসহ আগের দিনের খেলাগুলো ফেসবুকে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। তাই আজ ফাইনাল খেলা দেখতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিকাল ৩টায় এসেছি। মানুষের এমন উচ্ছ্বাস দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি’’।
তিনি আরও বলেন, “ফাইনাল খেলা শুরুর আগে থেকেই দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় ছিল। সড়ক থেকে ধরলা সেতু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের ঢল নামে। নানা ভোগান্তি উপেক্ষা করেও মানুষ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ মনোমুগ্ধকর খেলা উপভোগ করেছেন।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলাটি সত্যিই আনন্দদায়ক। খেলা দেখতে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। নদীর ঢেউয়ের মতো এ খেলা মানুষের মনকে নির্মল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। লোকজ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।
নৌকা বাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও খেলা পরিচালনাকারী শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল বলেন, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা। সময়ের পরিক্রমায় খেলাটি অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। নৌকা বাইচ আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ফিরে আসছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছেও এ খেলার পরিচিতি বাড়ছে।
খেলা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ। প্রথম পুরস্কার হিসেবে মহিষ, দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে গরু এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে ছাগল দেওয়া হয়। এ সময় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের এনসিপির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আই/এ