মজুরি নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষ ও চলমান আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে শ্রমিকদের উসকে দেওয়া, কারখানায় ভাঙচুর এবং শিল্প খাত অচল করার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে সামনে রেখে নেপথ্যে থেকে একটি চক্র পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। এ কাজে অর্থায়নের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বার্তা ছড়ানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা সংস্থাটি ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। জানা গেছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন পেলে এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতের অস্থিরতার পেছনে পতিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী এবং কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারে শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। এসব ঘটনার বিস্তারিত তথ্যসহ প্রতিবেদন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। জড়িতদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের ওপর নজরদারি চলছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত পোশাক শিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলা আন্দোলনের আড়ালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতা এবং অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মেট্রোরেল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলের মেট্রোরেল, ব্যাংক ও অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উসকানিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে তাদের কেউ কেউ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়ার শিল্পকারখানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মেট্রোরেল স্টেশন, ব্যাংকসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার জানান, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন করা স্বাভাবিক। তবে এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। পতিত সরকারের পক্ষ থেকে ডিসেম্বর ঘিরে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি তাদের কর্মীদের শ্রমঘন শিল্পাঞ্চলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারখানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ শ্রমিকেরা এ ধরনের কাজে জড়িত থাকতে পারেন না। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে অন্যদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা হচ্ছে। এ বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষকেই সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মালিকদের দ্রুত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। এ প্রক্রিয়ায় দেরি হলে গণ-অভ্যুত্থানবিরোধীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে।
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, চলমান আন্দোলনকে স্বাভাবিক বা সুস্থ আন্দোলন বলা যাচ্ছে না। সাধারণ শ্রমিকেরা এতে বিপাকে পড়ছেন। কাজে যোগ দিতে কারখানায় গেলেও তাদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়া হচ্ছে, পথ আটকে আন্দোলনে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ রাজি না হলে তার ওপর হামলা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গঠনমূলক আন্দোলনে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই এর দায় বহন করতে হবে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনের যৌক্তিকতা আর নেই। একটি গোষ্ঠী পোশাকশিল্পকে ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের শ্রমিকদের সহজেই প্রভাবিত করা যায় বলে তাদের লক্ষ্য করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিল্পমালিকেরা সব সময় শ্রমিকদের অবদানকে সম্মান করেন। কোনো সাধারণ শ্রমিক কারখানা ভাঙচুরে অংশ নিতে পারেন না। এসব ঘটনার পেছনে অপশক্তির ইন্ধন রয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা না গেলে এই শিল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।
এমএ//