খেলাধুলা

মাঠ ছাড়লেন মেসি, কাঁদল পুরো ফুটবলবিশ্ব

স্পোর্টস ডেস্ক

একটা সময় আসে, যখন কিংবদন্তিরাও থেমে যান। মাঠ থাকে, গ্যালারি থাকে, আলো থাকে, হাজারো মানুষের উল্লাস থাকে—শুধু সেই মানুষটি আর থাকেন না। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে সেদিন ঠিক এমনই এক সন্ধ্যা নেমেছিল।

নীল-সাদা জার্সিতে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবারের মতো মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি।

প্রতিপক্ষ বেনিন। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। তাই এটি আর দশটা প্রীতি ম্যাচের মতো ছিল না। এটি ছিল একটি যুগের শেষ অধ্যায়। যে অধ্যায়ে আছে দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা, একটি বিশ্বকাপ, অসংখ্য গোল, রেকর্ড আর কোটি মানুষের ভালোবাসা।

ম্যাচের ৭১তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করলেন মেসি। মুহূর্তেই বদলে গেল মনুমেন্টালের পরিবেশ। হাজারো কণ্ঠে উঠল একই ধ্বনি—‘মেসি, মেসি’। যেন পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে জানিয়ে দিল, এই মানুষটির বিদায় কোনো সাধারণ বিদায় নয়।

শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জিতল ৩-০ গোলে। নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজও গোল করেন। তবে সেদিন স্কোরলাইন নিয়ে খুব বেশি ভাবেনি কেউ। সবার চোখ ছিল একজনের দিকেই।

লিওনেল মেসি।

শেষ বাঁশির পর আকাশে দেখা গেল আলোর খেলা। ড্রোনের মাধ্যমে ফুটে উঠল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেই অমর ট্রফি। যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন মেসি। যে স্বপ্ন পূরণের পর তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও যেন পূর্ণতা পেয়েছিল।

আর সেই মনুমেন্টালই ছিল তার বিদায়ের জন্য সবচেয়ে আবেগের জায়গা। বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম ম্যাচও যে মাঠে খেলেছিলেন মেসি।

জাতীয় দলের হয়ে খেলার অনুভূতি কতটা গভীর, বিদায়ের আগের সেই মুহূর্তে সেটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন মেসি।

তিনি বলেন, “আমি চিরকাল ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। একজন ফুটবলারের জীবনে এর চেয়ে সুন্দর অনুভূতি আর কীই বা হতে পারে!”

কিন্তু যে গল্প এত সুন্দর, তার শেষটাও যে একদিন আসবে—সেটা মেসিও জানতেন।

ম্যাচের আগে দলের বাসেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। জাতীয় সংগীতের সময় পাশে ছিলেন তার তিন ছেলে—থিয়াগো, মাতেও ও চিরো। মাঠের চারপাশে তখন হাজারো মানুষ। তাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে এমন একজন, যাকে ঘিরেই আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি পুরো প্রজন্মের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে।

আবেগ সামলাতে পারেননি কোচ লিওনেল স্কালোনিও।

মেসির বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। আর্জেন্টিনার হয়ে এত বছর যার উপস্থিতি দলের শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্নের সঙ্গে মিশে ছিল, এবার সেই মানুষটিকেই ছাড়া সামনে এগোতে হবে।

মেসিও জানতেন, বিদায়টা সহজ হবে না।

তিনি বলেন, “এখন অনিবার্যভাবেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনের মুখোমুখি হচ্ছি। জাতীয় দলের জার্সিকে বিদায় জানাতে হবে—এই মুহূর্তটা সত্যিই খুব কঠিন।”

এই একটি মুহূর্তের পেছনে লুকিয়ে আছে মেসির পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দীর্ঘ গল্প।

একসময় আর্জেন্টিনার জার্সিই হয়ে উঠেছিল তার সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থতার পর শুনতে হয়েছে কঠোর সমালোচনা। ২০১৬ সালে তো আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

কিন্তু মেসি ফিরে এসেছিলেন।

তারপর বদলে যেতে থাকে গল্প।

২০২১ সালে জিতলেন কোপা আমেরিকা। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ। তারপর ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা।

যে ট্রফির জন্য এত বছর অপেক্ষা, শেষ পর্যন্ত সেটিই হাতে উঠল মেসির।

বিশ্বকাপ জয়ের সেই মুহূর্তে অবশ্য তার মনে সবচেয়ে বেশি এসেছিল বাবার কথা। হোর্হে মেসি বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহ পর ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের মুহূর্তেও বাবাকে মনে পড়ার কথা জানিয়েছিলেন মেসি।

তাই মনুমেন্টালে তার শেষ ম্যাচটি ছিল শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের অসংখ্য স্মৃতি।

ম্যাচের ১০ মিনিটে থামল খেলা। পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিল আর্জেন্টিনার ১০ নম্বরকে। বেনিনের খেলোয়াড়রাও এগিয়ে এসে মেসির সঙ্গে হাত মেলালেন। গ্যালারি থেকে আবারও ভেসে এলো সেই পরিচিত গান—

‘মেসি, মেসি...’

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের কয়েক সপ্তাহ পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। তখন তিনি বলেছিলেন, “সময় এসে গেছে।”

 

তবে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে শেষবারের মতো মাঠে নামানোর জন্য অনুরোধ করে। মেসিকে প্রাপ্য বিদায় দিতে বুয়েনস আয়ার্সের সবচেয়ে বড় এই স্টেডিয়ামের ৮৫ হাজারের বেশি টিকিট মাত্র ৯০ মিনিটে বিক্রি হয়ে যায়। পরে পুনর্বিক্রয় সাইটে টিকিটের দাম ২ হাজার ৫০০ ডলারেরও বেশি ওঠে। ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড় এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও এই বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

একসময় যাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই মেসিকেই শেষ পর্যন্ত অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানাল আর্জেন্টিনা।

ভক্তদের উদ্দেশে বিদায়ী বক্তব্যে মেসি বলেন— “আমি শুধু আপনাদের বলতে চাই, আমি আপনাদের ভালোবাসি এবং আপনাদের মিস করব। আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে এবং আপনাদের সবার সঙ্গে এই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে গর্বিত। আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।”

কথাগুলো খুব ছোট। কিন্তু এর ভেতরে জমে আছে ২১ বছরের ভালোবাসা, অপেক্ষা, হতাশা, লড়াই আর সাফল্যের গল্প।

বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন অবশ্য পূরণ হয়নি মেসির। গত জুলাইয়ে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

 

মেসি বলেন, “সর্বশেষ বিশ্বকাপ আমার ওপর বিশাল চাপ ফেলেছিল, আমি যা কিছু পার করেছি তার কারণে। আমাদের একটি স্বপ্ন ছিল—আমার স্বপ্ন এবং পুরো দেশের স্বপ্ন—আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া।”

জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ অধ্যায় শুধু আবেগে শেষ হয়নি। তিনি আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে বিদায় নিলেন। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচ ও গোল—দুই ক্ষেত্রেই তার ওপরে আছেন শুধু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

বিশ্বকাপে করেছেন ২১ গোল। খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপ। আর সবচেয়ে বড় অর্জন—ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন তিনি।

এখন জাতীয় দলের জার্সি খুলে রাখলেও মেসির ফুটবল থেমে যাচ্ছে না। ইন্টার মায়ামির হয়ে ক্লাব ফুটবলে খেলবেন তিনি। কিন্তু আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে আর তাকে দেখা যাবে না।

হয়তো কোনো একদিন আবার মনুমেন্টালের গ্যালারি ভরে যাবে হাজারো দর্শকে। আবার কোনো তরুণ ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবে। আবার নতুন কোনো তারকা আর্জেন্টিনার মানুষের স্বপ্ন হয়ে উঠবে।

কিন্তু মেসি আর ফিরবেন না। কারণ কিছু গল্পের শেষটা মেনে নিতে হয়, যতই কষ্ট হোক।

লিওনেল মেসির গল্পটাও তেমন।

তিনি শুধু গোল করেননি, শুধু ট্রফি জেতেননি। একটি প্রজন্মের আবেগ হয়ে উঠেছেন। কেউ তার খেলা দেখে বড় হয়েছে, কেউ গভীর রাতে ঘুম ভেঙে বিশ্বকাপ দেখেছে, কেউ তার গোলের সঙ্গে আনন্দ করেছে, আবার তার হারেও কেঁদেছে। তাই নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচটি শেষ হয়ে গেলেও তার গল্প শেষ হওয়ার নয়। কারণ একজন কিংবদন্তি মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারেন, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে নয়।

 

এসি//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #লিওনেল মেসি #আর্জেন্টিনা