স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিধ্বসে বিধ্বস্ত নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকা। প্রতি মুহুর্তে বাড়ছে লাশের সারি। এমন অবস্থায় সকলের মনেই প্রশ্ন কেন ঘটেছে এ বিপর্যয়। এ মহাবিপর্যয়ের কারণ হিসাবে বিজ্ঞানীর দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তার জানতে চাইছেন ভূমিকম্পের কারণেই পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়েছিল, নাকি তুষারধসটি এতটাই বিশাল ছিল যে তার প্রভাবেই ভূমিকম্পের মতো কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে নেপালের গণমাধ্যম দ্যা নেপাল টাইমস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার নেপালের সময় অনুযায়ী ঠিক সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে চীন সীমান্তের কাছে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ঠিক সেই সময়েই লাংটাং পর্বতের উত্তর ঢালে বিশাল এক তুষারধসের ঘটনা ঘটে।
লাংটাং লিরুং পর্বতটি সম্পূর্ণভাবে নেপালের ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থিত। তুষারধসের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ ও কাদার স্রোত চীন-নেপাল সীমান্তের ‘লেন্দে খোলা’ নদী প্রবাহকে আটকে দেয়—যে নদীটি মূলত সীমান্তরেখা হিসেবে কাজ করে। এরপরই সেই আটকে পড়া জলাধারটি ভেঙে এবং কাদা ও বিশাল পাথরের এক প্রবল স্রোত ত্রিশূলী নদীর মধ্য দিয়ে নেপালের দিকে ধেয়ে আসে।
‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণকারী বিশেষজ্ঞরা অন্তত এমনটাই ধারণা করছেন। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে ভূমিকম্পের কারণেই পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়েছিল, নাকি তুষারধসটি এতটাই বিশাল ছিল যে তার প্রভাবেই ভূমিকম্পের মতো কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যদি ভূমিকম্পই এই ঘটনার মূল কারণ হয়ে থাকে, তবে এটি এমন একটি পাহাড়কে কাঁপিয়ে দিয়েছিল যার বরফ ও তুষারস্তর বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আগেই অস্থিতিশীল বা আলগা হয়ে পড়েছিল।
এছাড়া ঘটনাটি ঘটেছে বর্ষাকালের একেবারে শেষ পর্যায়ে, যখন পাহাড়ের ঢালগুলো বরফে ভারাক্রান্ত ছিল এবং হিমবাহ সরে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট হিমবাহ-বাহিত শিলাখণ্ড ও পলিরাশি—যা আগে স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফের কারণে শক্তভাবে আটকে থাকত—সেগুলোর ভেতরেও অতিরিক্ত পানি ঢুকে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল।

যদিও এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়টি নেপালের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি হিমবাহ থেকে শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, তবুও এটি তিব্বত মালভূমি অঞ্চল থেকে উদ্ভূত আন্তঃসীমান্ত বিপর্যয়ের ক্রমবর্ধমান দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে—যেমন তিব্বতীয় মালভূমি থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা, স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফস্তর গলে যাওয়া এবং গলিত হিমবাহের রেখে যাওয়া আলগা পাথর, মাটি ও বরফের প্রাকৃতিক প্রাচীর ভেঙে ধসের ফলে আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
নেপাল টাইমস বলছে, এবারের বিপর্যয় যে পাহাড় থেকে সেই 'লাংটাং লিরুং'-এর রয়েছে এক মর্মান্তিক ইতিহাস। কাঠমান্ডু থেকে ঠিক ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ৭,২৪৫ মিটার উচ্চতার এ পর্বতটিতে ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে দক্ষিণ ঢালে তুষারধসের সৃষ্টি হয়। সেই তুষাররাশি নিচে থাকা হিমবাহের ওপর আছড়ে পড়ে এবং লাংটাং গ্রামটিকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে দেয়। এতে অন্তত ৩০০ মানুষ প্রাণ হারান।
তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, প্রাথমিকভাবে ওই এলাকায় ভূমিকম্প হয়েছে ধারণা করা হলেও। পরবর্তীতে নিকটবর্তী ভূকম্পন কেন্দ্রগুলোর তথ্য, দীর্ঘ-পর্যায়ের ভূকম্পন তরঙ্গ এবং উপগ্রহের ছবির বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, আসলে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি।
ইউএসজিএস (USGS) এক হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে, এর পরিবর্তে হিমবাহ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের (debris flow) কারণেই এই ভূকম্পন-সদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
সংস্থাটি এই ঘটনার মাত্রা (যেটিকে পূর্বে ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়েছিল) ৪.৪ থেকে সংশোধন করে ৫.২-এ উন্নীত করেছে। ইউএসজিএস আরও জানায় যে, হিমবাহ ধসে পড়া ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের ফলে ভাটির দিকে বা নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছিল।
কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রূপবিজ্ঞান (জিওমরফোলজি) বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিয়েল শুগার জানিয়েছেন, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় একটি পাহাড়ের গা থেকে হিমবাহ খসে পড়ার ফলে এই আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। বুধবারের স্যাটেলাইট ছবির সাথে মঙ্গলবারের—অর্থাৎ নেপালে বিপর্যয় আঘাত হানার আগের দিনের—ছবির তুলনা করে তিনি বলছেন, ওই এলাকার হিমবাহগুলো থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ সরে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
শুগার বলেন, পাহারের উপরের দিকে থাকা বরফ গলে প্রচুর পরিমাণ পানি হিমবাহের ভেতরে প্রবেশ করে থাকতে পারে। এরপর সেই পানি হিমবাহের তলদেশের দিকে চুঁইয়ে গিয়ে সেটিকে পাহাড়ার থেকে আলগা করে দেয় এবং হিমবাহটি ধসে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, হিমবাহের এই আকস্মিক ধস এবং এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এটিই হয়তো যথেষ্ট ছিল।
আই/এ