লিওনেল মেসি বল পায়ে দৌড় শুরু করলেই যেন বদলে যায় পুরো মাঠের দৃশ্য। চারপাশ থেকে একের পর এক ডিফেন্ডার ঘিরে ধরেন, কেউ ধাক্কা দেন, কেউ বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যান আর্জেন্টাইন মহাতারকা। গ্যালারিতে বসা দর্শক থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দার সামনে থাকা কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে তখন একই প্রশ্ন—এটা কীভাবে সম্ভব?
অনেকেই একে জাদু বলেন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান। প্রকৃতি মেসিকে এমন একটি শারীরিক গঠন দিয়েছে, যা তাকে ফুটবল মাঠে অন্যদের চেয়ে আলাদা সুবিধা এনে দেয়। তাই ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার এই আর্জেন্টাইন তারকাকে অনেক ক্রীড়া বিশ্লেষক ‘বিজ্ঞানের বিস্ময়’ বলেও অভিহিত করেন।
মাটির কাছাকাছি ভরকেন্দ্রই বড় শক্তি
আধুনিক ফুটবলে যেখানেপর্তুগিজ অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বা সুইডিশ ফুটবলার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ–এর মতো লম্বা ও শক্তিশালী ফুটবলারদের আধিপত্য দেখা যায়, সেখানে মেসির গড়ন একেবারেই ভিন্ন। তার উচ্চতা তুলনামূলক কম এবং শরীরের অনুপাতে পায়ের দৈর্ঘ্যও কিছুটা ছোট।

কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্রীড়া বিজ্ঞান বা বায়োমেকানিক্স বলছে, কোনো বস্তুর ভরকেন্দ্র (সেন্টার অব গ্রাভিটি) যত মাটির কাছাকাছি থাকে, সেটির ভারসাম্য তত ভালো হয়। মেসির শরীরের ভরকেন্দ্রও মাটির খুব কাছাকাছি।
এ কারণেই দৌড়ের সময় তিনি সহজে ভারসাম্য হারান না। লম্বা ডিফেন্ডাররা গতি পরিবর্তনের সময় যেখানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, সেখানে মেসি মুহূর্তেই শরীর ঘুরিয়ে দিক বদলে ফেলতে পারেন। প্রতিপক্ষের ধাক্কা সামলেও বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অন্যতম কারণও এই ভারসাম্য।
ছোট পা, কিন্তু দ্রুততম গতি
মেসির ড্রিবলিংয়ের আরেকটি বড় রহস্য তার অবিশ্বাস্য দ্রুত পায়ের নড়াচড়া, যাকে বলা হয় ‘কুইক ফিট’।
এখানেও কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের একটি সহজ নিয়ম—দোলক বা পেন্ডুলাম নীতি। দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম যত ছোট হয়, সেটি তত দ্রুত দুলতে পারে। ঠিক তেমনি তুলনামূলক ছোট পা হওয়ায় মেসি খুব দ্রুত পা নাড়াতে পারেন।
অন্যদিকে লম্বা খেলোয়াড়দের পায়ের দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় তাদের পা ঘোরাতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। পদার্থবিজ্ঞানে এটিকে জড়তা বা ‘ইনারশিয়া’ বলা হয়।
ফলে একজন ডিফেন্ডার যখন একবার ট্যাকল করার চেষ্টা করেন, মেসি ততক্ষণে কয়েকবার বলের দিক বদলে ফেলেন। ছোট ছোট স্পর্শে বলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে সামনে এগিয়ে যান তিনি।

প্রতিভা আর বিজ্ঞানের নিখুঁত মেলবন্ধন
ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভুগেছিলেন লিওনেল মেসি। সময়মতো চিকিৎসা না হলে হয়তো ফুটবল বিশ্ব এই কিংবদন্তিকে পেতই না। কিন্তু নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা! সেই তুলনামূলক ছোট গড়নই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
মেসির অসাধারণ ড্রিবলিং, মুহূর্তে দিক বদলে ফেলার ক্ষমতা কিংবা প্রতিপক্ষের চাপেও ভারসাম্য ধরে রাখার দক্ষতা শুধু অনুশীলনের ফল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তা এবং শরীরের এমন একটি গঠন, যা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও প্রায় নিখুঁত।
তাই মেসি যখন বল পায়ে দৌড়ান, তখন তিনি শুধু একজন ফুটবলারের মতো খেলেন না; যেন মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর পাঠটি জীবন্ত করে তোলেন।
এসি//