পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের দাবি উঠলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে রাজি নন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পাওয়ার কথা বললেও মমতার অভিযোগ, এই নির্বাচনী ফলাফল ‘চুরি করা’ হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে ভোটে কারচুপি করা হয়েছে।
মমতার এই অবস্থানকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে গভর্নর আরএন রবির হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে পরাজয়ের পরও পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অবস্থান নিয়েছেন, তা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মঙ্গলবার (০৫ মে) সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে মমতা দাবি করেন, তিনি নির্বাচনে হারেননি। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির যোগসাজশে অবৈধ উপায়ে এই ফল তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি হারিনি... তাই রাজভবনে যাব না। আমি পদত্যাগপত্র দেব না’। এ সময় দীর্ঘ ১৫ বছর বিজেপিকে প্রতিহত করে আসা ‘রাজপথের লড়াকু’ নেত্রীর ভূমিকাতেই দেখা যায় তাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতির বড় কোনও নজির নেই।
ভারতের সংবিধানে সরাসরি কোথাও বলা নেই যে, নির্বাচনে হারলে মুখ্যমন্ত্রীকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। তবে গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী নির্বাচনে পরাজয়ের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের অংশ হিসেবে পদত্যাগ করাই প্রচলিত প্রথা।
মূল বিষয় হলো— একজন মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকার জন্য বিধানসভার আস্থা থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত ফলাফলে যদি স্পষ্ট হয় যে সেই সমর্থন আর নেই, তাহলে সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী তার পদত্যাগ করা উচিত।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যদি পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানান, যেমনটি মমতা করেছেন, তাহলে গভর্নরের হাতে কিছু সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সুপারিশ করা, অর্থাৎ বিধানসভা স্থগিত করে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাজ্যকে নিয়ে যাওয়া।
তবে এটিকে চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয় এবং সাধারণত শেষ বিকল্প হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ভারতীয় সংবিধানের ১৬৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা ‘গভর্নরের সন্তুষ্টি পর্যন্ত’ দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ প্রয়োজনে গভর্নর তাদের বরখাস্তও করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই পরিস্থিতিতে গভর্নর প্রথমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে বলতে পারেন। তিনি তা প্রমাণে ব্যর্থ হলে গভর্নর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, অর্থাৎ এক্ষেত্রে বিজেপিকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন।
বিজেপির দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নেই। তবে তৃণমূল নেত্রী উল্টো দাবি করে বলছেন, অন্তত ১০০টি আসনের ফল ‘চুরি’ করা হয়েছে। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন এবং অন্যান্য অবৈধ পদ্ধতির মাধ্যমে ফল পাল্টে দেয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী, তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে ৬৮টি কম।
এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যায় মমতা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘নোংরা খেলা’ খেলার অভিযোগ তোলেন। তিনি মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও বিহারের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিরোধী জোটের পরাজয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ‘গণতন্ত্র এভাবে চলে না। বিচারব্যবস্থা যখন কার্যকর থাকে না, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে এবং কেন্দ্র একদলীয় শাসন চায়, তখন বিশ্বে ভুল বার্তা যায়।’
এসি//