ভারতের জরুরি অবস্থার উত্তাল সময়, ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট তখন ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা জয়প্রকাশ নারায়ণ সেই সময় কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ যুব কংগ্রেসের কিছু কর্মী তার গাড়ি আটকে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাটি রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক দৃশ্যে।
ভিড়ের মাঝ থেকে সুতির শাড়ি পরা এক তরুণী হঠাৎ উঠে পড়েন গাড়ির বোনেটে। তিনি সরাসরি ওই প্রবীণ গান্ধীবাদী নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। ঘটনাস্থলে থাকা ফটোগ্রাফাররা সেই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেন। তখন কেউই জানতেন না, এই তরুণীর নামই ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে এক শক্তিশালী অধ্যায়ের সূচনা করবে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই দিন থেকেই তার রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে রাজপথ।
সেই তরুণীই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী, বয়স ৭১ বছর। টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জনঅসন্তোষের অভিযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিজেপি রাজ্যে বড় ধরনের উত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলে সফল হয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে।
তবে মমতার রাজনৈতিক যাত্রা বলছে, প্রতিকূলতা তার জন্য নতুন কিছু নয়। জীবন শুরু থেকেই সংগ্রাম তার সঙ্গী। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। মমতার দাবি অনুযায়ী, চিকিৎসার অভাব ও সরকারি বকেয়া বিল না মেটানোর কারণে তার বাবার মৃত্যু ঘটে। বাবার মৃত্যুর পরদিনই ৬০ হাজার টাকার একটি চেক এলেও তা নিয়ে তিনি পরে বলেছিলেন—এটা শুধু কাগজ, বাস্তবতা বদলায়নি।
কলেজ জীবনে সংসারের ভার কাঁধে নিয়ে তিনি ভোরে উঠে পরিবারের জন্য রান্না করতেন, তারপর কলেজে যেতেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ সুতির শাড়িই ছিল তার নিত্যসঙ্গী, যা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৭০ সালে কলকাতার জোগমায়া দেবী কলেজে পড়াশোনার সময়ই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ছাত্রী পরিষদের নেতৃত্ব দেন। পরে ১৯৭৬ সালে মহিলা কংগ্রেসের বঙ্গ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৮৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে প্রথমবার লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়ে দীর্ঘ সময় কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্র ধরে রাখেন।
১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়ে তিনি দেশের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রীদের একজন হন। পরে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ১৯৯৭ সালে গঠন করেন নিজের দল—তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তিনি একাধিকবার রেল ও কয়লা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন।
তার রাজনৈতিক জীবন আন্দোলনের রাজনীতি দিয়ে গড়া। ১৯৯২ সালে ন্যায়বিচারের দাবিতে রাইটার্স বিল্ডিংসের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে ১৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তীতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন—সবই তাকে রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখে পরিণত করে। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন।
ক্ষমতায় এসে তিনি একদিকে যেমন কন্যাশ্রী ও লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো সামাজিক প্রকল্প চালু করেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও নারী নিরাপত্তা ইস্যুতে একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েন। বিরোধীদের দাবি, শাসনকালে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রাজ্য রাজনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।
এদিকে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বড় জয় নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এবার বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের অবস্থানে অনড় থেকে দলের কর্মীদের গণনাকেন্দ্রে থাকার নির্দেশ দেন এবং ভোট গণনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
সব মিলিয়ে, একসময় কলেজ স্ট্রিটের সেই শাড়ি পরা তরুণীর শুরু হওয়া পথ আজ এসে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায়—যেখানে ইতিহাস বদলেছে, আর বদলে গেছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার সমীকরণও।
এসি//