আন্তর্জাতিক

থালাপতি বিজয়: রাজনীতির ময়দানে চমক দেখালেন পর্দার সুপারস্টার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তামিল সিনেমার পর্দায় দীর্ঘদিন ধরে যিনি ‘থালাপতি বিজয়’ নামে দর্শকদের হৃদয় জয় করে আসছেন, এবার তিনি সেই পরিচিত পর্দা পেরিয়ে সরাসরি রাজনীতির ময়দানেও তৈরি করেছেন নতুন ইতিহাস। একসময় যিনি চলচ্চিত্রে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নায়কোচিত চরিত্রে দাপট দেখিয়েছেন, সেই জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর এখন বাস্তব রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান শক্ত করছেন।

মাত্র দুই বছর আগে, ২০২৪ সালে তিনি গঠন করেন নিজের রাজনৈতিক দল—তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। দল গঠনের পর থেকেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, বরং তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেন তামিল জনগণের অধিকার, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং শাসনব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্নে এক বিকল্প কণ্ঠ হিসেবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীতির সমালোচনাও করেন তিনি, যা দ্রুতই আলোচনায় আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

নির্বাচনী মাঠে এসে চমক দেখিয়েছে বিজয়ের দল। ২৩৪ আসনের বিধানসভায় টিভিকে জয় পেয়েছে ১০৭টি আসনে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ আসনের কিছুটা কম থাকলেও, একক দল হিসেবে সর্বাধিক আসন পাওয়ার কৃতিত্ব এখন তাদের দখলে। ফলে জোট রাজনীতির ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়িত হয়, তবে ৪৯ বছর পর তামিলনাড়ু আবারও দেখতে পারে এক চলচ্চিত্র তারকার মুখ্যমন্ত্রী—এর আগে ১৯৭৭ সালে এম জে রামচন্দ্রন সেই ইতিহাস গড়েছিলেন।

বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি তার ভক্তদের সংগঠিত করতে শুরু করেন ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। শুরুতে এটি ছিল শিক্ষা সহায়তা, দুর্যোগে সাহায্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের সামাজিক কাজের একটি সংগঠন। ধীরে ধীরে এটি তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।

পরবর্তীতে ২০১১ সালে এই সংগঠন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ের উপস্থিতি সিনেমার বাইরে রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করতে শুরু করে। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে তার সরাসরি সমালোচনা তাকে আরও স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে আসে।

ধীরে ধীরে তার সিনেমার অডিও লঞ্চ, জনসভা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তরুণদের বেকারত্ব, সুশাসন এবং দুর্নীতি বিরোধী বক্তব্য গুরুত্ব পেতে থাকে। শহর ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে এসব বক্তব্য গভীর প্রভাব ফেলে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে তার সংগঠনের সাফল্য প্রমাণ করে—তার জনপ্রিয়তা শুধু ভক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ভোটেও রূপ নিতে সক্ষম।

২০২৪ সালে দল ঘোষণার পর তিনি চলচ্চিত্র জগত থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় তিন দশকের অভিনয়জীবনে তিনি ৭০টিরও বেশি সিনেমায় কাজ করেছেন। রাজনীতিতে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা ছিল—এটি কোনো শখ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।

পরবর্তী দুই বছরে টিভিকে একটি ফ্যান সংগঠন থেকে সংগঠিত রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়। জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলে তারা মাঠপর্যায়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে তারা প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনে।

তবে এই পথচলা একেবারে মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে একটি নির্বাচনী সমাবেশে ভিড়জনিত দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা দল এবং বিজয়ের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে তার প্রথম বড় সংকট ছিল এটি। তবে ঘটনার পর তার সংযত প্রতিক্রিয়া এবং দায়িত্বশীল অবস্থান তাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি করে দেয়।

সব মিলিয়ে, সিনেমার সুপারস্টার থেকে রাজনীতির মাঠে বিজয় এখন শুধু তারকা নন, বরং এক সম্ভাব্য ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবেও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছেন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তার এই উত্থান ভবিষ্যতের সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #তামিল সিনেমা #থালাপতি বিজয় #তামিলনাড়ু