ঢাকার সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সংঘটিত রানা প্লাজা ধসের ভয়াবহ ঘটনার ১৩ বছর পূর্ণ হলো আজ ২৪ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত এই ট্র্যাজেডি আজও স্মৃতিতে বেদনার ছাপ রেখে গেছে।
২০১৩ সালের এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমজীবী মানুষ। পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার শ্রমিক পঙ্গুত্ববরণ করেন, যাদের অনেকেই আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর মোট ৬টি মামলা দায়ের করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত সমাপ্তি পায়নি।
নিহতদের স্বজন এবং আহত শ্রমিকরা আজও সেই বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এখনো তাদের প্রধান দাবি হয়ে রয়েছে।
বার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রানা প্লাজার সামনে সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সংগঠন ক্ষতিপূরণ আদায় সংগ্রাম কমিটি। সংবাদ সম্মেলনে সাতটি দাবি জানানো হয়। পরে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন শ্রমিক ও সামাজিক সংগঠন আজও নানা কর্মসূচি নিয়েছে।
রানা প্লাজা ধসে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনায় করা হত্যা মামলাটি এখনো সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অষ্টম আদালতে। মামলার নথিতে দেখা যায়, ৩০ এপ্রিল এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এই মামলায় সাক্ষী ৫৯৪ জন। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলার ৪১ আসামির মধ্যে শুধু প্রধান আসামি ও ভবনমালিক সোহেল রানা কারাগারে রয়েছেন। মামলার অন্য দুই আসামি তাঁর মা-বাবা মারা গেছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক এবং অন্যরা জামিনে রয়েছেন। ঘটনার সময় সোহেল রানা সাভার পৌর যুবলীগের নেতা ছিলেন।
মামলাটির বিষয়ে আদালতের অতিরিক্ত পিপি ফয়সাল মাহমুদ বলেন, আমরা চেষ্টা করছি মামলাটি দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করতে। ধার্য তারিখে সাক্ষী নিয়মিত এলে দ্রুততম সময়ে মামলার বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
দুদকের দায়ের করা সম্পদের তথ্য গোপনের মামলাটি কেবল নিষ্পত্তি হয়েছে। এই মামলায় ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক। এছাড়া ভবন নির্মাণ দুর্নীতির মামলাটি যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। বাকি তিনটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে এবং একটির কার্যক্রম স্থগিত আছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, হত্যা মামলাটি গত বছরের ১২ অক্টোবর জেলা জজ আদালত থেকে ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়। এখানে নতুন করে ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। ফলে মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো। আদালত আগামী ৩০ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা ও ইমারত আইনের মামলা দুটি ২০১৬ সালে বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়। ওই বছরের ১৫ মার্চ মামলাগুলো ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। ১৬ জুন ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে এবং ১৮ জুলাই হত্যা মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন আদালত।
মামলার চার্জশিটভুক্ত ৪১ জন আসামির মধ্যে ভবন মালিক সোহেল রানা বর্তমানে কারাগারে আছেন। বাকিদের মধ্যে ১৩ জন পলাতক, ২৫ জন হাইকোর্ট থেকে জামিনে এবং ২ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।
ভবন ধসের পরদিন সাভার থানার উপ-পরিদর্শক আলী আশরাফ অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা করেন। এছাড়া গার্মেন্টস শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার আদালতে পৃথক একটি হত্যা মামলা করলে আদালতের নির্দেশে দুটি মামলা একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। ৪১ জন আসামির মধ্যে সোহেল রানা কারাগারে আছেন। তার বাবা আব্দুল খালেক ও মা মর্জিনা বেগম মারা গেছেন। পলাতক রয়েছেন সাভারের সাবেক পৌর মেয়র মো. রেফাত উল্লাহসহ ১৩ জন এবং ২৫ জন জামিনে আছেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ফয়সাল মাহমুদ বলেন, এখন পর্যন্ত ১৪৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ৩০ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকজন সাক্ষ্য দেবেন বলে আশা করছি। ভুক্তভোগীদের স্বজন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য প্রায় শেষ। এখন সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তারদের সাক্ষ্য নিতে পারলেই এ বছরের মধ্যে রায় পাওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, শেষ হাসিনার সময় এটাতে সাক্ষ্যগ্রহণে অগ্রগতি ছিল না। এখন এসে মামলাটি রায়ের দিকে যাচ্ছে।
৬ তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগে দুদকের উপ-পরিচালক এস এম মফিদুল ইসলাম মামলাটি করেন। মামলাটি তদন্ত করে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সংস্থটির উপপরিচালক মো. নাসিম উদ্দিন ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে এটি ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ শারমিন আফরোজের আদালতে যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী শুনানির জন্য ১৭ মে তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শাহিন শাহ পারভেজ ধামরাই থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করেছিলেন, যেখানে সোহেল রানা একমাত্র আসামি। বর্তমানে মামলা দুটি প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারক এ.বি এম. আশফাক উল হকের আদালতে বিচারাধীন। আগামী ৩০ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য আছে।
ইমারত বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ওই সময় সোহেল রানাসহ ১৩ জনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল আহমেদ। সিআইডি তদন্ত শেষে এ মামলায় সোহেল রানা ও তার বাবা-মাসহ ১৮ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। এ মামলায় ১৩৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে এই মামলার সম্পর্কে জানা গেছে, ২০২৪ সালের বছরের ১৯ নভেম্বর ঢাকার সাবেক জেলা ও দায়রা জজের তৎকালীন বিচারক এএইচএম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার আদালত বিচারিক ক্ষমতা বলে হত্যা মামলাটির পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটিও নেন। যাতে পাশাপাশি দ্রুত এই দুই মামলার বিচারকার্য শেষ হয়। তবে, ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি যাওয়ার পরেও এখন পর্যন্ত কোনও তারিখ পড়েনি। পরবর্তীকালে আবারও ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি পাঠানো হয়েছে। মামলাটির বিচার কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। এই মামলায় আসামির সংখ্যা ১৬ জন। এই মামলায় সবাই জামিনে রয়েছেন।
এসি//