দেশজুড়ে

সাগরে বাড়ছে অবৈধ ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য, বিপর্যয়ের মুখে মাছসহ সামুদ্রিক প্রাণি

কামরুল হাসান, পটুয়াখালী প্রতিনিধি

অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ,অবৈধ জালের ব্যবহার ,সমুদ্র দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারনে বঙ্গোপসাগরে দিন দিন মৎস্য উৎপাদন উল্লেখ যোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

 তবে অন্যসব কারণ এর চেয়ে জেলেরা সমুদ্রে অবৈধ ট্রলিং বোটের মাধ্যমে মৎস্য আহরণকে এ সংকটের জন্য বেশি দায়ী করছেন।

তাদের দাবি ২০২২-২৩ সালে উপকূলীয় অঞ্চলে কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা কাঠ বডিকে রূপান্তরিত করে অবৈধ ভাবে লোহার যন্ত্রাংশ স্থাপন করে ট্রলিং বোটে প্রস্তুত করে নির্বিচারে মাছ শিকার করছে।

সংশ্লিষ্ট্র সূত্র জানাচ্ছে বর্তমানে কলাপাড়া উপকূলে শুধু মাত্র শিববাড়িয়া চ্যানেলে আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রায় ৬০ টির অধিক কাঠের তৈরি ট্রলিং বোট বা ট্রলার রয়েছে। এসব অবৈধ ট্রলিং বোট যে পরিমাণ মাছ আহরন করে, তার একটা অংশ পচে যাবার কারণে সমুদ্রে ফেলে আসে।

 ট্রলিং বোট কি

মাছ ধরার সাধারণ ট্রলারের চেয়ে, ট্রলিং বোটের জাল সমুদ্রের আরও বেশি গভীরে কিংবা তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এ ধরণের নৌযানে ব্যবহৃত বটম ট্রলিংপদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ পৌছে গিয়ে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন অণুজীবের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। এতে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে এসব ট্রলিং বোটে ফিস ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার, উইঞ্চ মেশিনসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে মাছের ঝাঁক সহজেই শনাক্ত করে গণহারে তা আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

এছাড়া এ নৌযানে আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চির ছোট ফাঁসের বারি বেহুন্দি জাল ব্যাবহার করা হয় এতে ছোট-বড় মাছ ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য একসাথে জালে ধরা পড়ে। এতে তুলনামূলক বড় মাছের চাপে ছোট মাছ ও অন্য জলজ প্রাণিগুলো মারা যায়। 

কুয়াকাটার সমুদ্রগামী উপকূলীয় জেলেরা জানান এসব ট্রলিং অগভীর সমুদ্রে বা সৈকত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবাধে মাছ শিকার করে চলছে এতে করে মাছের খাদ্য, নানা প্রজাতির শৈবাল ও মাছের আবাসস্থল পুরোপুরি ধংস হচ্ছে।

এসব ট্রলিং গুলো মৎস্য আহরণে সরকারের নীতিমালা তোয়াক্কা না করে সমুদ্রে দাপটের সাথে মাছ শিকার করে চলছে।

আলীপুর মৎস্য বন্দরের ব্যাবসায়ীরা জানান,  সমুদ্রে এখন আর আগের মত মাছ নেই। দিন যত যাচ্ছে সমুদ্রে রুপালি ইলিশসহ মৎস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে । সমুদ্রে অবৈধ ট্রলিং ও অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করে মৎস্য আহরণে সরকারের নীতিমালা প্রয়োগ করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সামুদ্রিক অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। যার প্রভাব মৎস্য ব্যাবসায়ী ও জেলে সহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের উপর পড়বে।

বরগুনা লটাকাটা ইউনিয়ন এর আফান মাঝি  বলেন, আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে যাই, কিন্তু মাছ পাই না। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক প্রকাশ্যে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এগুলো বন্ধ করা সম্ভব। তাহলে বন্ধ হচ্ছে না কেন,বলে মৎস্য কর্মকর্তা দের দিকে আঙ্গুল তুলেন, আমার যা খরচ তাতো পাইনা লোকদের বেতন দেবো কি দিয়ে কুব বিপদে আছি,আমি অনেক পুরোনো মাঝি আারতে জেল কেটেছি ২৪ দিন, কিভাবে টিকে থাকবো সমস্যা, 

মহিপুর এর মাছুম মাঝি বলেন,  '২-৩ লক্ষ টাকার বাজার নিয়ে  সাগরে গিয়ে জাল মাছ কিছুই থাকেনা। অবৈধ ট্রলিং জাল কেটে দেয়। আগে সাগরে মাছ ছিলো, এখন মাছ পাই না। কার কাছে বলবো আমাদের  কথা কেউ শোনে না'।

কুতুবদিয়ার জালাল মাঝি বলেন, ' আমদের কথা কেউ শোনেনা টাকার কাছে সবাই  বিক্রি হয়ে গেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের  দাবি অবৈধ ট্রলিং এর হাত থেকে আমাদের মৎস্য সম্পদ কে রক্ষা করেন, ৪-৫ লক্ষ টাকার বাজার নিয়ে  সাগরে গিয়ে শুন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে'। 

জেলে আবুল কাশেম বলেন, 'ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য রেনু ধ্বংস হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সাগরে আর মাছই থাকবে না'।

ট্রলিং এর গডফাদার বলে পরিচিত আবুল কোম্পানির আবুল মিয়ার সাথে ফোনে কথা বলতে চাইলে ফোন দিলে তিনি বলেন,  'সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চাইনা, যা বলার মৎস্য বিভাগ এর সাথে বলবো। এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন।'

ক্ষুদ্র নৌকার জেলেদের অভিযোগ, 'বিশাল ট্রলিং বোটগুলো তাদের জালের ওপর দিয়েই চলাচল করে। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে যায়। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করলেও জোটে হুমকি-ধমকি। কয়েক বার শত শত জেলে মানববন্ধন সংবাদ সম্মেলন করে অবৈধ ট্রলিং বন্ধের দাবি তুললেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি'।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেনট্রলিং বোটের মাছ ধরা বন্ধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে চিঠি দিয়ে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলকে 

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান কে এ প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে ফোন করলে তিনি কুয়াকাটা নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে যেতে বলেন। পরে তিন ঘন্টা অপেক্ষা করার পরও তিনি আসেননি।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আই/এ