ফুটবল

মিশরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা

খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক রূপকথা লিখল আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তবে খাদের শেষ প্রান্ত থেকে ফিরে আসার এক অবিস্মরণীয় গল্প উপহার দিলেন তিনি।

প্রথমার্ধে মেসির পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় গোল হজম করে আর্জেন্টিনা ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিল মিশর। কিন্তু মহাতারকা মেসি এত দ্রুত বিদায় নিতে চাননি। শেষ মুহূর্তের জাদুকরী এক গোল ও এক অ্যাসিস্টে তিনি আলবিসেলেস্তেদের দেখালেন জয়ের পথ। এরপর ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের করা জয়সূচক গোলটি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ৩-২ ব্যবধানের এক ঐতিহাসিক জয় এনে দেয়।

রোমাঞ্চকর এই জয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। শেষ বাঁশি বাজতেই তার চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে।

আগের ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের পর এই ম্যাচের একাদশে কিছু সাহসী কৌশলগত পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মেদিনা, থিয়াগো আলমাদা ও লাউতারো মার্টিনেজের জায়গায় তিনি অভিজ্ঞ ও শক্তিমত্তা বাড়াতে মাঠে নামান তাগলিয়াফিকো, পারেদেস ও জুলিয়ান আলভারেজকে।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করে ফেলে মিশর। ফলস্বরূপ, ম্যাচের ১৪ মিনিটেই সফল কর্নার থেকে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে দারুণ এক হেডে  গোল করেন ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম। 

তবে চার মিনিট পরেই সমতায় ফেরার মোক্ষম সুযোগ আসে, যখন বক্সের ভেতর তাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু মেসির স্পট-কিকটি রুখে দিয়ে তাকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের মুখোমুখি করেন মিশরীয় গোলরক্ষক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে দুটি এবং সব মিলিয়ে চারটি পেনাল্টি মিসের নেতিবাচক রেকর্ড গড়েন তিনি।

পেনাল্টি মিসের হতাশা ভুলে আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখলেও মিশরের ৬ জনের রক্ষণভাগ ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মাঝমাঠকে ব্যবহার করে এবং তাগলিয়াফিকোর উইং ধরে আক্রমণের চেষ্টা করলেও প্রথমার্ধে মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর একাই যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দারুণ সব সেভে প্রথমার্ধের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন তিনিই।

বিরতির পর আর্জেন্টিনার চাপ বাড়লেও ম্যাচের ৫৮ মিনিটে দারুণ এক কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে মোস্তফা জিকো আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠান। তবে ভিএআর (VAR) পরীক্ষায় লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করার বিষয়টি ধরা পড়ায় গোলটি বাতিল হয়। অবশ্য মিশরকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায়নি। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে আর্জেন্টিনার এক কর্নার থেকে বল কেড়ে নিয়ে দুর্দান্ত গতিতে রক্ষণভাগ চূর্ণ করেন হাসান। তার বাড়ানো পাসে ফাঁকায় থাকা জিকো এবার আর গোল করতে ভুল করেননি। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালের সুবাস পেতে শুরু করে মিশর।

ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে আর্জেন্টিনার সামনে সমতায় ফেরার চ্যালেঞ্জটা ছিল পাহাড়সম। তবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা অলআউট আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেসির মাপা ক্রস থেকে হেডে গোল করে ব্যবধান ২-১ এ নামিয়ে আনেন ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। এর পরপরই মেসির আরেকটি আক্রমণ থেকে বদলি নামা লাউতারো মার্টিনেজ সুযোগ পেলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

কিন্তু অধিনায়ক মেসি হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। একটু পরেই ডি-বক্সের ভেতর বল পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ২-২ করেন তিনি। এটি ছিল চলতি আসরে তার অষ্টম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২১তম গোল।

ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রোমাঞ্চের তখনও বাকি ছিল। মিশরের তারকা সালাহ বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে আর্জেন্টিনা। উইং ধরে বল নিয়ে লাউতারো মার্টিনেজ বক্সের ভেতর দুর্দান্ত এক ক্রস বাড়ান এনজো ফার্নান্দেজের উদ্দেশ্যে। ইনজুরি টাইমে সেই বল জালে জড়িয়ে আর্জেন্টিনার ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় নিশ্চিত করেন এনজো।

গোল উদযাপনে জার্সির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্যাজের দিকে আঙুল উঁচিয়ে যেন মনে করিয়ে দিলেন, কেন তারা সেরা। মাত্র ১৩ মিনিটের এই অবিশ্বাস্য ঝড়ে টিকে রইল আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বারের মতো সোনালী ট্রফি জয়ের স্বপ্ন। আর ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হলো আরও একটি কালজয়ী মহাকাব্যের।

আর/আই 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন