হাসিমুখের ঘাতকের মহাকাব্য, ব্রাজিলকে বিদায় করে ইতিহাস লিখলেন হালান্ড
কেউ তাকে বলেন গোলমেশিন, কেউ ডাকেন ‘হাসিমুখের ঘাতক’। তবে ফিফা বিশ্বকাপের এই রাতে আর্লিং হালান্ড যেন শুধু একজন স্ট্রাইকার নন, তিনি হয়ে উঠলেন পুরো একটি জাতির স্বপ্নের প্রতীক। শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নরওয়েকে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে এনে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিলেন ২৫ বছর বয়সী এই তারকা।
ম্যাচ শেষে আবেগঘন কণ্ঠে হালান্ড বলেন, “এটি নরওয়ের ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য একটি দিন।”
কথাটি শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং বাস্তবতারও প্রতিফলন। কারণ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এমন কীর্তি এর আগে কখনো গড়তে পারেনি নরওয়ে।
লম্বা দেহ, শক্তিশালী শারীরিক গঠন, বিস্ফোরক গতি এবং গোলের সামনে অবিশ্বাস্য শান্ত স্বভাব—এই চার বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়েই হালান্ড আজ বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর স্ট্রাইকার। একশ পঁচানব্বই সেন্টিমিটার উচ্চতার এই ফরোয়ার্ড জানেন, ঠিক কোন মুহূর্তে আঘাত হানতে হয়। আর ব্রাজিলের বিপক্ষে সেটিই আবারও প্রমাণ করলেন তিনি।

তবে ম্যাচের শুরুটা মোটেও তার মতো ছিল না। দীর্ঘ সময় বলের দখল পাননি, আক্রমণেও খুব বেশি দেখা যায়নি। প্রথমার্ধ শেষে কোচ স্টালে সোলবাকেন তাকে আলাদা করে ডেকে বলেন, নিজের সব শক্তি উজাড় করে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে। কোচের সেই কথাই যেন নতুন প্রাণ জোগায় হালান্ডকে।
এরপর বদলে যায় পুরো ম্যাচ। ঊনআশিতম মিনিটে দুর্দান্ত এক হেডে নরওয়েকে এগিয়ে দেন তিনি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই আরও একটি গোল করে ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিত করেন। মুহূর্তেই তিনি পরিণত হন নরওয়ের জাতীয় নায়কে।
এই দুই গোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠেছে। মাত্র ৫৪ ম্যাচে করেছেন ৬২ গোল, অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি তার গোলের গড় ১ দশমিক ১৫। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে তিনি এখন অনেকটাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গত ১৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচেই করেছেন ২৭ গোল—যা আধুনিক ফুটবলে বিরল এক ধারাবাহিকতা।

দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরা নির্বাচিত হলেও নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে রাজি নন হালান্ড। বরং সব প্রশংসা তুলে দেন গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইলান্ডের হাতে।
“আমার মতে, ম্যাচসেরা সে-ই। আমি গোল করেছি ঠিকই, কিন্তু সে এমন কয়েকটি বল বাঁচিয়েছে, যেগুলো গোল হলে হয়তো আমরা বাড়ি ফিরে যেতাম। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পেছনে তার অবদানই সবচেয়ে বড়। তাকে আমি অনেক শ্রদ্ধা করি,” বলেন নরওয়ের অধিনায়ক।
এই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের লড়াইটাও জমে উঠেছে। এখন পর্যন্ত সাতটি করে গোল করে কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে উঠে এসেছেন হালান্ড। অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং এমবাপে। নরওয়ের হয়ে হালান্ডের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হচ্ছিল প্রায় তিন দশক পর দেশকে বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সেই সীমা পেরিয়ে এবার তিনি বিশ্বমঞ্চেই নিজের আলাদা গল্প লিখে ফেলেছেন।
নিজের সাফল্যের রহস্য জানতে চাইলে হালান্ড বলেন, “এই টুর্নামেন্টে আমি কয়েকবার মনে করেছি, নিজের সেরা ছন্দে পৌঁছে গেছি। কিন্তু প্রতিবারই বুঝেছি, আরও ওপরে ওঠা যায়। আমি এক-দুটি সুযোগ পেলেই সাধারণত গোল করে ফেলি। আসলে আমি কী করি, সেটা নিজেও জানি না। আমি শুধু মনোযোগ ধরে রাখি। সুযোগ এলে জানি কী করতে হবে। এই রাতটা আমি কখনো ভুলব না।”

ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করলেও তিনি সেটিকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখতে নারাজ।
“এই গোল শুধু আমার নয়। এটি তাদের, যারা নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। এটি তাদের, যারা কঠিন সময়েও আমাদের বিশ্বাস করেছে। এটি নরওয়ের প্রতিটি শিশুর, যারা আজ থেকে বিশ্বাস করবে—অসম্ভব বলে কিছু নেই।”
জয়ের আবেগে নিজের চোখে জল চলে এসেছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি।
“আজকের রাত নরওয়ের প্রতিটি ঘরে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আমরা শুধু ব্রাজিলকে হারাইনি, পুরো জাতিকে এমন একটি স্মৃতি উপহার দিয়েছি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে। এরপর যা-ই ঘটুক, এই অনুভূতি, এই অশ্রু কিংবা ইতিহাসের এই মুহূর্ত কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।”
মাঠের বাইরেও হালান্ডের জনপ্রিয়তা কম নয়। বিশ্বকাপে আসার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মজার স্ন্যাপচ্যাট স্টোরি ও ইনস্টাগ্রাম পোস্টের জন্য তিনি তরুণদের কাছে আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন। গম্ভীর তারকার বদলে নিজেকে সহজ-সরল, হাসিখুশি এবং রসিক একজন মানুষ হিসেবেই তুলে ধরেছেন তিনি।

ব্রাজিলকে হারানোর পরও সেই পরিচিত রূপেই দেখা গেল তাকে। লকার রুম থেকে গলায় জার্সি জড়িয়ে দুষ্টুমিভরা একটি ছবি পোস্ট করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছবিটি লক্ষ লক্ষ মানুষের পছন্দ অর্জন করে।
হালান্ডকে থামানো কেন এত কঠিন, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি। তার মতে, হালান্ডের আসল শক্তি শুধু গতি বা শারীরিক সামর্থ্য নয়, বরং সময়জ্ঞান।
“সে পুরো ম্যাচজুড়ে ডিফেন্ডারদের সঙ্গে অযথা লড়াই করে না। পর্যবেক্ষণ করে, অপেক্ষা করে। একজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় কখন এক মুহূর্তের জন্য মনোযোগ হারায়, সেটি সে নিখুঁতভাবে বুঝতে পারে। তারপর এক সেকেন্ডেই অদৃশ্য হয়ে যায়। আপনি ৮৯ মিনিট তাকে সামলে রাখতে পারেন, কিন্তু ফুটবল নির্ধারিত হয় কয়েকটি মুহূর্তে। আর সেই মুহূর্তগুলো কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে হালান্ড সম্ভবত বিশ্বের সেরা।”
তিনি আরও বলেন, “এ কারণেই ডিফেন্ডাররা তার বিপক্ষে খেলতে পছন্দ করে না। পুরো ম্যাচে মনে হবে তাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। কিন্তু হঠাৎ দেখবেন, সে আবারও গোল উদযাপন করছে।”

ইতিহাস গড়ার পরও সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড। মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ আটে উঠেছে হ্যারি কেইনের দল। শনিবারের সেই লড়াইয়ে আবারও দেশের হয়ে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ পাবেন হালান্ড।
তবে আপাতত পুরো নরওয়ে মগ্ন এই ঐতিহাসিক জয়ের উচ্ছ্বাসে। উদযাপনের অংশ হিসেবে মাঠে বিখ্যাত ভাইকিং দাঁড়টানা নৌকার প্রতীকী হাল ধরে স্বদেশবাসীর উদ্দেশে হালান্ডের একটাই বার্তা ছিল—
“সবাই শুধু আনন্দ করুন। আজকের দিনটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। যেমন বলেছি, এটি নরওয়ের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দিন। এই মুহূর্তটাকে নিজের করে নিন, উপভোগ করুন।”
হাসিমুখে বলা সেই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একটি জাতির বহু বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি। আর সেই অপেক্ষার অবসানের কেন্দ্রে ছিলেন একজনই—আর্লিং হালান্ড।
এসি//