স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

বায়ান্ন প্রতিবেদন

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে গুমের প্রতিটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে, তিনি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তিনি।

রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষায় থাকতে হবে না। গুমের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩০ আগস্ট গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা, বেদনা ও অনিশ্চয়তার কথা মনে করিয়ে দেয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

তিনি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলা হয় না; এর সঙ্গে একটি পরিবারের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং আর্থসামাজিক স্থিতিও নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের জীবন, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

দেড় দশকের ‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গ

বিগত দেড় দশকে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। কাউকে কাউকে গোপনে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন অস্বীকার করেছে।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ বহু মানুষের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাদের স্বজনদের দীর্ঘদিন ধরে বেদনা, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ ভিন্নমতের ব্যক্তি, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিকদেরও বছরের পর বছর অন্ধকার ও আলো-বাতাসহীন কথিত ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও একসময় গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এলেও এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান রাষ্ট্রপতি।

‘প্রতিশোধ নয়, প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে’

১৯৭১ সালে গণতন্ত্র, সাম্য, বাক্‌স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছেন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার পর সেই দেশেই গুম ও হত্যার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম ও হত্যার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

গুম-খুনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষকেও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।

নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের পথে এগোতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তদন্ত কমিশনে ১ হাজার ৫৬৯ গুমের তথ্য

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত।

নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও গুমের বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

গুম প্রতিরোধে নতুন আইন

এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভুক্তভোগী আগে, এখনই পদক্ষেপ’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে গুমের ঘটনা বন্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দায়িত্বও রাষ্ট্রের

শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘদিন প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক অনিশ্চয়তা দূর করার দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, তারা এমন একটি বাংলাদেশ চান যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয়ের পরিবেশ থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের অধীন থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিচার করা যায় না। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সুশাসন এবং নাগরিকের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনও রাষ্ট্রের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।

গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সুশাসন, জবাবদিহিতা ও বাক্‌স্বাধীনতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি। গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাবে—এ প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #আয়নাঘর #বাংলাদেশ #মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর