রংপুর মহানগরীর কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
অন্যদিকে, চারজনের ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, নিহতদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম মো. রফিকুল ইসলামের খাসকামরায় হাজির করা হয়। সেখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রাতে দুজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক মিলন চ্যাটার্জি জানান, জবানবন্দিতে দুই আসামি হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু তথ্যও তারা জানিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে গণপতি চক্রবর্তীর নিজ বাড়ি থেকে তার, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রীতিলতা তার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো একসময় হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে পূজা বোনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে চারজনের মুঠোফোনই বন্ধ পান। সন্দেহ হওয়ায় তিনি স্বামী বিপুল আচার্যকে সঙ্গে নিয়ে গণপতির বাড়িতে যান। বাড়িটি অন্ধকার থাকায় এবং ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় তারা প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে ওঠেন। পরে জানালার তালা ভেঙে ভেতরে তাকিয়ে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো এবং পচা গন্ধ দেখতে ও পেতে পান।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। সেখানে তারা মাদক সেবন করছিলেন। এ সময় গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন এবং বকাঝকা করেন। বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে গণপতির গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তার চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে এলে সিঁড়ির কাছে তাকেও শ্বাসরোধ করা হয়। পরে মেয়ে প্রার্থীকে এবং সর্বশেষ ১২ বছরের শিশু আয়ুশকে হত্যা করা হয়। প্রিয়ম আসামিদের চিনত এবং ঘটনা প্রকাশ করে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে প্রিয়মের বন্ধুত্ব ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পরও কিছু সময় বাড়িটির ভেতরে অবস্থান করেন দুই আসামি।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করেন, আবার মাদক সেবন করেন এবং ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খান। মাদকের প্রভাব কমাতে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খাওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
পরে ঘরের আসবাবপত্র, আলমারি, শোকেস ও কাপড়চোপড় তছনছ করে ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশ মনে করছে। ঘর থেকে স্বর্ণালংকারও নেওয়া হয়। সিদ্ধার্থ সোনার দোকানে কাজ করায় আগুন দিয়ে স্বর্ণ পরীক্ষা করার পদ্ধতি জানত। তদন্তে এমন একটি স্বর্ণের চুড়ি আগুনে পরীক্ষার আলামত পাওয়ার পর তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে। পরে আসামিদের দেখানো মতে একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, বাড়ির দুটি মুঠোফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি ও কামড় দেওয়া শসাও উদ্ধার করা হয়েছে। খেজুরের বিচি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এদিকে রোববার সন্ধ্যায় চারটি মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, মরদেহের মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়ার পেছনে পচন ধরার বিষয়টি রয়েছে। সেখানে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি। নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙারও কোনো প্রমাণ ময়নাতদন্তে মেলেনি।
ময়নাতদন্তের সময় চারটি মরদেহ থেকেই প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।
এর আগে রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করে পুলিশ। পরে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।
পুলিশের দেওয়া ঘটনার বিবরণ এবং ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কিছু বিষয়ে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙা এবং নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়ার কারণ নিয়ে ফরেনসিক পরীক্ষায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র স্পষ্ট করতে এখন সিআইডির পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং তদন্তের পরবর্তী তথ্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসি//