খেলাধুলা

যে কৌশলে মেসির আর্জেন্টিনাকে নিষ্প্রভ করে বিশ্বকাপ জিতল তরুণ স্পেন

স্পোর্টস ডেস্ক

মাত্র এক মাস আগেও বিশ্বকাপে স্পেনের শুরুটা ছিল হতাশাজনক। টুর্নামেন্টে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। কিন্তু ৩৪ দিন পর সেই দলই নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ইতিহাস লিখল।

ফাইনালে ২০২২’র চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে লা রোহা। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ম্যাচের পর ম্যাচ নিজেদের আরও পরিণত করে তুলেছে তারা। নকআউট পর্বে পৌঁছে যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় স্পেন, আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দেখায় নিজেদের সেরা ফুটবল।

পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। সেই সঙ্গে টানা অপরাজিত থাকার ধারাও পৌঁছে গেছে অবিশ্বাস্য ৩৮ ম্যাচে। ফাইনালে বলের দখল, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠিত রক্ষণে আর্জেন্টিনাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয় ইউরোপের চ্যাম্পিয়নরা।

তারুণ্যের ওপর আস্থা, সেখানেই সাফল্যের ভিত্তি

বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮ দলের মধ্যে ষষ্ঠ সর্বকনিষ্ঠ দল ছিল স্পেন। তাদের গড় বয়স ছিল মাত্র ২৬ দশমিক ১৯ বছর, আর ৩০ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র ছয়জন।

তুলনায় ব্রাজিল দলে ৩০ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন ১১ জন এবং তাদের গড় বয়স ছিল ২৮ দশমিক ৬৫ বছর।

অভিজ্ঞতার চেয়ে তারুণ্যের ওপর ভরসা করার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। দলের অন্যতম ভরসা পাউ কুবারসি ও লামিন ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৯ বছর। ফাইনালের জয়সূচক গোলের সহায়ক নিকো উইলিয়ামসের বয়স ২৪, আর বার্সেলোনার মিডফিল্ডার পেদ্রির বয়স ২৩।

হোঁচট খেয়েও ফিরে দাঁড়ানোর গল্প

আটলান্টায় কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল স্পেন। আফ্রিকার নবাগত দলটির গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে গোলের দেখা পায়নি ইউরোপিয়ানরা। সেই ফল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে সেই ধাক্কা দ্রুত সামলে নেয় স্পেন। গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবকে সহজেই হারানোর পর উরুগুয়েকেও ১-০ গোলে পরাজিত করে।

শেষ বত্রিশে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্বস্তির জয় পেলেও পরের দুই নকআউট ম্যাচে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাদের। পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে শেষ সময়ে জয়সূচক গোল করে নায়ক বনে যান মিকেল মেরিনো। তাঁর দুই গোলই স্পেনকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেয়।

ইয়ামালের উপর নির্ভর করার কোনো প্রয়োজন নেই

বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও গোল পাননি লামিন ইয়ামাল। ম্যাচ শেষে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তরুণ এই ফরোয়ার্ড বলেছিলেন, স্পেন যদি ট্রফি জেতে, তাহলে তিনি গোল করেছেন কি না—সেটা কেউ মনে রাখবে না।

শেষ পর্যন্ত তার সেই কথাই সত্যি হয়েছে।

বিশ্বকাপে স্পেনের সর্বোচ্চ পাঁচ গোল এসেছে মিকেল ওইয়ারসাবালের কাছ থেকে। মিকেল মেরিনো ও পেদ্রো পোরো করেছেন দুটি করে গোল। আর ফাইনালে শিরোপা নিশ্চিত করা গোলটি এসেছে ফেরান তোরেসের পা থেকে।

পরিসংখ্যানে ইয়ামালের অবদান হয়তো খুব বড় নয়—একটি গোল, কোনো অ্যাসিস্ট নেই। কিন্তু মাঠের খেলায় তাঁর প্রভাব ছিল অসাধারণ। প্রতিটি ম্যাচেই খেলেছেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হয়েছেন ম্যাচসেরা। আর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আদায় করে নেন গুরুত্বপূর্ণ একটি পেনাল্টি।

সেমিফাইনালে কৌশলের শ্রেষ্ঠত্ব

প্রথম তিনটি নকআউট ম্যাচে দাপট দেখিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। অনেকের চোখে তারাই ছিল শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার।

কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তে সেমিফাইনালে দেখান অসাধারণ কৌশলগত দক্ষতা। ২-০ গোলের জয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল অলিসেদের মতো তারকাদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয় স্পেন।

দানি ওলমো, রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের মাঝমাঠ পুরো ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে। ফলে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ পর্যাপ্ত বলই পায়নি। প্রথমার্ধে এগিয়ে যাওয়ার পরও আক্রমণের ধার কমায়নি স্পেন। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষকে মূলত দূরপাল্লার শটেই সীমাবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয় তারা।

ফাইনালেও একই আধিপত্য

ফাইনালে সেমিফাইনালের একাদশেই আস্থা রাখেন দে লা ফুয়েন্তে। আর সেই সিদ্ধান্তও সঠিক প্রমাণিত হয়।

স্পেন বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখে। ১২০ মিনিটে আর্জেন্টিনা মাত্র দুটি শট নিতে পারে, যার একটিও লক্ষ্যে ছিল না। অন্যদিকে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বলের দখল ধরে রেখে মানসিক ও শারীরিক—দুই দিক থেকেই প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলে স্পেন।

ম্যাচের শেষ দিকে হতাশা থেকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস জোরালো শটে জালের ছাদে বল পাঠিয়ে নিশ্চিত করেন স্পেনের বিশ্বকাপ জয়।

সামনে আরও সোনালি সময়?

ইউরোপ ও বিশ্ব—দুই আসরের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই এখনও ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে পৌঁছাননি। লামিন ইয়ামাল, পাউ কুবারসি, পেদ্রি ও নিকো উইলিয়ামসদের মতো তারকারা ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় থাকবেন পূর্ণ পরিণত বয়সে।

নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০৩০ বিশ্বকাপকে ঘিরেও স্বপ্ন দেখছে স্পেন। এর আগে ২০২৮ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যও থাকবে তাদের সামনে।

এরই মধ্যে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেছেন প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর অধীনেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের সাফল্যের এই অধ্যায় আরও দীর্ঘ হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #স্পেন #আর্জেন্টিনা #ফিফা ২০২৬ #বিশ্বকাপ