সাভারে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত একটি রাস্তা ও ড্রেনের কাজ আনতে সাড়ে সাত লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঐ এলাকার বাড়ির মালিকরা। বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
সরেজমিনে জানা যায়, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে এবং স্থানীয় সরকারের কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (এলজিসিআরআরপি) আওতায় সাভার পৌরসভার জামসিংয়ের জয়পাড়া এলাকায় এক কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটার ইউনিব্লক সড়ক এবং ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪০ টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ চলছে। কিন্তু এই প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে শুধু আরসিসি সড়কের জন্য বরাদ্দ আসে। সেখানে কোন ড্রেন ছিল না।
এতে স্থানীয় কয়েকজন বাড়ির মালিক তৎকালীন পৌর প্রশাসক ও ইউএনও আবু বকর সরকারের কাছে গেলে তিনি বাজেট স্বল্পতার কথা জানান। পরে তারা নিজ উদ্যোগে ড্রেন করতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন এবং একাধিক জুমার নামাজে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর বাড়ি প্রতি ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে প্রায় ১০ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। এরমধ্যে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে দ্বিতীয় ধাপে আসে ড্রেনের বরাদ্দ। শুরু হয় রাস্তা ও ড্রেনের কাজ। কিন্তু সরকারি অর্থে শুরু হওয়া কাজের বিষয়টি জানেন না অনেকে।
আর টাকা উত্তলনে নেতৃত্ব দেন বাইতুল মামুর কেরামাতীয়া জামে মসজিদের সভাপতি, সেক্রেটারি খন্দকার ফরহাদ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ হাজী মো. শামসুদ্দিন, তার ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স এবং স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও মাসুমসহ কয়েকজন ব্যক্তি।
মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স বলেন, ‘আমার ছয় তলা বাড়ি আছে। কিন্তু ড্রেন ছাড়া রাস্তা দিয়ে আমরা কি করবো? এজন্য যখন শুধু রাস্তার কাজ আসে তখন ড্রেন করার জন্য আমরা সরকারের বিভিন্ন দফতরে দৌঁড়ঝাপ শুরু করি। ওইসময় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও বিষয়টি আমরা জানাই। একসময় বিশেষ এক জায়গা থেকে আমরা আশ্বাস পাই, টাকা দিলে সরকারিভাবে ড্রেনের জন্য বাজেট বরাদ্দ পাওয়া যাবে। তখন আমরা টাকা তুলে জমা দেই। কিন্তু কার কাছে দিছি তা বলা যাবে না।’
পৌরসভার কোন কর্মকর্তার টাকা দেয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তাও তিনি পরিষ্কার করেননি। বলেন, ‘আমরা একাধিক ব্যক্তির কাছে টাকা দিয়েছি কয়েক ধাপে। আমাদের কাছে শুনতে চাইয়েন না। আমি বলতে পারব না। শুধু সরকারি ব্যক্তি না, আরও অনেকেই আছে। এখন আমাদের টাকার বিনিময়ে ড্রেনের বরাদ্দ এসেছে না কি হয়েছে তা জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, তারা সাড়ে সাত লাখ দিয়েছেন এই রাস্তার বরাদ্দ আনার জন্য। সব মিলে ১০ লাখ টাকা উঠেছিল। বাকি টাকা বিভিন্ন জায়গায় দৌঁড়ঝাপসহ খাওয়া-দাওয়া করতে খরচ হয়েছে। সব হিসেব তাদের কাছে আছে।
এদিকে, টাকা দেওয়ার পর এলাকাবাসী জানতে পারে, প্রকল্পটি বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে হচ্ছে এবং এ কাজে স্থানীয়দের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। এরপর থেকেই এলাকায় ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী হাজী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ড্রেন নিজেদের টাকায় করতে হবে বইলা আমাদের বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে টাকা নিছে। আমি ১০ হাজার টাকা দিছি। আমরা তো মনে করেছি এটি আমাদের টাকায় হচ্ছে। কিন্তু এখন শুনতেছি এটি সরকারি টাকায় হচ্ছে। আমাদের কথা ছিল হানিফ সাহেবের বাড়ির সামনে থেকে ড্রেন আসবে। কিন্তু যদি ওই পর্যন্ত না যায়, তাহলে আমাদের বলছে পাইপ দিয়া আমাদের বাড়ির পানি ড্রেনে এনে ফেলবে। এখন দেখা যাক কি হয়।’
অপর বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ড্রেন করার জন্য মসজিদে বসে কমিটির মাধ্যমে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দিছে। এখন শুনতেছি এটা সরকারি কাজ। এখন ওই টাকা কে কি করছে তা জানি না।
যদিও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে মসজিদের সেক্রেটারি খন্দকার ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এক টাকাও আত্মসাৎ করিনি। কেউ যদি এমন অভিযোগ করে তা ভিত্তিহীন। টাকা আমরা কয়েকজন মিলেই দিয়েছি একটা জায়গায়। কিন্তু আমাদের তো এলাকায় থাকতে হবে। আমি যদি নাম বলি তাহলে আমার কোন ক্ষতি হলে তখন দেখবে কে?’
জানা যায়, প্রথম ধাপে ৮০০ মিটার আরসিসি রাস্তার বরাদ্দ হয়। কিন্তু ড্রেন না থাকায় পৌরসভার প্রকৌশলীরা সেটি বাতিল করেন। ব্যাখ্যা হিসেবে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, আরসিসি রাস্তার সাথে ড্রেন ছিল না। পরে কোন না কোন সময় ড্রেন হবে। তখন ওই রাস্তা আবার ভাঙতে হবে। এজন্য পরে ইউনিব্লক রাস্তা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যাতে ভাঙলেও ক্ষতি কম হয়। পরে যখন ড্রেনের বাজেট পাশ হয়, তখন এভাবেই রাস্তার কাজ এখন হচ্ছে।
তাহলে ড্রেন না থাকার বিষয়টি দেখার পরও শুরুতে কেন আরসিসি রাস্তার জন্য পরিকল্পনা ও বাজেট পাশ করানো হলো- জানতে চাইলে আলম মিয়া নিজেদের গাফলতির কথা স্বীকার করেননি।
এ বিষয়ে পৌর প্রশাসক ও ইউএনও সাইফুল আলম জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। কে বা কারা সরকারি কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছে তা তদন্ত করা হবে। আর যদি আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয় তাহলেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আই/এ