খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুটি ইউনিটে বিভক্ত এই কেন্দ্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে আজ, আর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও সমান গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। নির্মাণ পর্যায়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে এবং সেপ্টেম্বর নাগাদ দুই ইউনিট মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম ইউনিটের সঞ্চালন লাইনের কাজ গেল বছরের মে মাসে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের সঞ্চালন লাইন নির্মাণও দ্রুতগতিতে চলছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।
রূপপুর প্রকল্পে ইউরেনিয়াম জ্বালানি রিঅ্যাক্টরের কোরে স্থাপন করা হবে, যা নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন করবে। এই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং সেখান থেকেই উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংক্রিয় চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
ভিভিইআর-১২০০ ডিজাইনের এই রিঅ্যাক্টরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে। এরপর শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ, যেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। ধাপে ধাপে এর সক্ষমতা ৩ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে, যা সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগবে।
৩০ শতাংশ ক্ষমতায় পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানো হবে এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা চলতে থাকবে। পুরো কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এর মেয়াদ আরও ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। একবার জ্বালানি লোড করলে তা দেড় বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে, ফলে ঘন ঘন জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না।
উল্লেখ্য, প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যার ৯০ শতাংশ ঋণ সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। এই ঋণ ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম প্রকল্পটির সার্বিক তত্ত্বাবধান করছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকেও রূপপুরে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।