ইতোমধ্যে কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি এই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। বজ্রপাত কেবল তাৎক্ষণিক মৃত্যু ডেকে আনে না, যারা বেঁচে যান তাদের অনেকের শরীরেও রেখে যায় ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন।
চিকিৎসকদের মতে, বজ্রাঘাতে পেশিতে তীব্র ব্যথা, হাড় ভেঙে যাওয়া, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, খিঁচুনি, শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যাওয়া, চোখে ছানি এমনকি হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই বজ্রঝড়কে কখনোই সাধারণ আবহাওয়াগত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বজ্রপাত শুরু হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দ্রুত শক্তপোক্ত ভবন বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া। ঘরের ভেতরে থাকলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু নিয়ম মানা জরুরি। দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও ল্যান্ডফোন ব্যবহার বন্ধ করা এবং পানির কল, শাওয়ার বা জলাধার থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ বজ্রপাত সরাসরি ভবনে আঘাত না করলেও বৈদ্যুতিক সংযোগ বা পানির মাধ্যমে এর প্রভাব ঘরের ভেতরে পৌঁছে যেতে পারে।
বাইরে অবস্থান করলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেকেই বৃষ্টির সময় গাছের নিচে আশ্রয় নেন, অথচ এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ধাতব কাঠামোতে বেশি আঘাত হানে। ফলে এসব স্থানের আশপাশে থাকাও প্রাণঘাতী হতে পারে। গাড়িতে থাকলে জানালা বন্ধ রেখে ভেতরে অবস্থান করাই তুলনামূলক নিরাপদ। পাশাপাশি খালি পায়ে না থেকে রাবারের সোলযুক্ত জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ঝড় বা বৃষ্টি থেমে গেলেই বাইরে বের হওয়া নিরাপদ নয়—শেষ বজ্রধ্বনির অন্তত ৩০ মিনিট পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত। কারণ অনেক সময় মূল ঝড় কেটে যাওয়ার পরও বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে যায়।
শিশুদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রপাতের শব্দ ও ঝড়ো পরিবেশ শিশুদের মধ্যে তীব্র ভয় তৈরি করতে পারে। তাই আগে থেকেই তাদের সহজ ভাষায় নিরাপত্তা নিয়ম শেখানো জরুরি, যাতে বিপদের সময় তারা আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ, স্থানীয় সতর্কবার্তা মেনে চলা এবং ঝড়প্রবণ এলাকায় আগাম নিরাপদ আশ্রয়ের পরিকল্পনা করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বজ্রপাত ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত অসংখ্য জীবন রক্ষা করতে পারে। প্রকৃতির এই ভয়ংকর শক্তির সামনে সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে—তাই জীবন বাঁচাতে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
এসি//