আন্তর্জাতিক

ইসরাইলে ‘মরণ কামড়’ দিতে যাচ্ছে হিজবুল্লাহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান–সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ আবারও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগের সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য বড় ধরনের ইসরাইলি হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কায় তারা দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে গেরিলা কৌশলের দিকে ঝুঁকছে। 

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) চারটি লেবাননি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা এখন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করছে। তারা এমন ধরনের যোগাযোগ যন্ত্র ব্যবহার এড়িয়ে চলছে, যেগুলো সহজেই ইসরাইলের নজরদারির আওতায় পড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় গুরুত্বপূর্ণ ট্যাংক–বিধ্বংসী রকেটও সীমিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইসরাইল আগের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রায় ১৫ মাস পর আবারও উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ইসরাইল হামলা চালায় গোষ্ঠীটি।

চলমান সংঘাতে প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দিয়েছে। 

তবে গোষ্ঠীটি বলছে, তাদের এই পদক্ষেপ ছিল ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ এবং ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পরও অব্যাহত ইসরাইলি হামলার প্রতিক্রিয়াতেই তারা এ পথে হাঁটছে।

সূত্রগুলোর মতে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যেও ইসরাইল লেবাননে নতুন করে আক্রমণাত্মক অভিযান চালাতে পারে। তবে হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ কৌশল অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব টিকে থাকে কি না তার ওপর। সেই পরিস্থিতি আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে, যেখানে হিজবুল্লাহর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকতে পারে।

সিরিয়া ও ইসরাইলি সীমান্তে সংঘর্ষ

হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকটি সূত্র বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের মতে, সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় গোষ্ঠীটি কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে—এ ধরনের বিস্তারিত তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিসও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।

হিজবুল্লাহ ১৯৮২ সালে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত একটি শিয়া মুসলিম সংগঠন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের লেবাননের গৃহযুদ্ধ শেষে দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করা ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে কয়েকটি গোষ্ঠী অস্ত্র ধরে রাখে, তাদের মধ্যে হিজবুল্লাহ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে ইসরায়েল ওই এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে।

ইসরাইলি বাহিনীকে দক্ষিণ লেবানন থেকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর ভূমিকার কারণে লেবাননের অনেক শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ে। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্তটি শিয়া সমাজের ভেতরেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি হিজবুল্লাহর জন্য এক বড় মোড়ের মুহূর্ত।

২০২৪ সালের যুদ্ধে সংগঠনটি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে লেবাননের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ বাড়ছে। গত সপ্তাহে বৈরুত সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

একই সময়ে তাদের আঞ্চলিক অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের ফলে ইরান থেকে হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র ও সরঞ্জাম পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত স্থলযুদ্ধের বেশিরভাগ সংঘর্ষ লেবানন-ইসরাইল-সিরিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত খিয়াম শহরের আশপাশে কেন্দ্রীভূত ছিল। 

হিজবুল্লাহ মনে করে, সম্ভাব্য কোনো ইসরাইলি স্থল আক্রমণ এই অঞ্চল দিয়েই শুরু হতে পারে।

এদিকে রয়টার্স গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পর দক্ষিণ লেবানন থেকে সরিয়ে নেয়া হিজবুল্লাহর অভিজাত রাদওয়ান বাহিনী যোদ্ধারা আবার ওই এলাকায় ফিরে এসেছে।

একটি ইসরাইলি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ উত্তেজনা কমাতে চাইছে-এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং পরিস্থিতি উল্টো দিকেই যাচ্ছে। যদিও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) হিজবুল্লাহর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হত্যা করেছে। তবুও গোষ্ঠীটি দ্রুত তাদের নেতৃত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অভিযান পরিচালনা চালিয়ে যেতে পারছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লেবাননের দুটি সূত্র জানিয়েছে, ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যেতে প্রতিটি হিজবুল্লাহ কমান্ডারের জন্য চারজন করে ডেপুটি নিয়োগ করা হয়েছে, যাতে কোনো কমান্ডার নিহত হলেও নেতৃত্বে বড় ধরনের শূন্যতা না তৈরি হয়।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি, ২ মার্চ থেকে তারা হিজবুল্লাহর শত শত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ বৈরুতের হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ শহরতলি এবং পূর্বের বেকা উপত্যকায় বিমান হামলাও রয়েছে।

একই সময়ে দক্ষিণ লেবাননে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ইসরাইল। সেখানে তাদের কিছু সেনা ২০২৪ সাল থেকেই অবস্থান করছিল। উত্তর ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর হামলা থেকে রক্ষা করতে সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান জোরদার করা হয়েছে। লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত লেবাননে দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহও পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরাইলের দিকে প্রায় প্রতিদিনই ড্রোন ও রকেট হামলা চালাচ্ছে।

লেবাননের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের সংঘাতের সময় ইসরাইল শুধু হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত শত শত পেজার ডিভাইসেই ফাঁদ পাতেইনি, বরং গোষ্ঠীটির ব্যক্তিগত ফোন নেটওয়ার্কেও অনুপ্রবেশ করেছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো বলছে, সেই অভিজ্ঞতার পর হিজবুল্লাহ এখন এমন সব যোগাযোগ যন্ত্র এড়িয়ে চলছে যেগুলোতে সহজে আড়ি পাতা যেতে পারে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #ইরান #হিজবুল্লাহ #ইসরাইল #হামলা