ইরানজুড়ে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভ এখন ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শুরুতে অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও এখন আন্দোলনের মূল দাবি হয়ে উঠেছে সরকার পতন। বিক্ষোভকারীরা সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগ দাবি করছেন।
রাজধানী তেহরান ছাড়াও কোম, ইসফাহান, মাশহাদ, কেরমানশাহ, বান্দার আব্বাস, ফারদিস ও বোজনুর্দসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। অনেক জায়গায় সরকারি ভবন, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কার্যালয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন দেয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের নিজ দেশের পতাকা ছিঁড়ে ফেলতেও দেখা গেছে। এমনকি প্রয়াত বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্যেও হামলা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। গত বৃহস্পতিবার (০৮ জানুয়ারি) রাত থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইরানে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সহিংস বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন শুক্রবার (০৯ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে জানায়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন—রাজধানীর ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২০৬ থেকে ২১৭ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই গুলিবিদ্ধ এবং তাদের অধিকাংশ তরুণ। চিকিৎসকের দাবি অনুযায়ী, শুক্রবার এসব মরদেহ হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে হতাহতের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে টাইম ম্যাগাজিন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব তুলনামূলকভাবে কম। ইরানি মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৬৩ জন, যাদের মধ্যে ৪৯ জন বেসামরিক নাগরিক।
এদিকে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহে সংঘর্ষের সময় বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আট সদস্য নিহত হয়েছেন।
সহিংসতা বাড়তে থাকায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, যারা দেশে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার আর ছাড় দেবে না। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও এক বিবৃতিতে জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি তারা আর চলতে দেবে না। তেহরানের পাবলিক প্রসিকিউট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নাশকতা বা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরান সরকারকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে এর কঠিন মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের দাবিতে রূপ নিয়েছে, যা ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশটিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এসি//