ভারতের নয়াদিল্লি বিমানবন্দর থেকে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, ব্যক্তি হিসেবে নয়, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে যাওয়ায় সেখানে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আমি ওখানে ব্যক্তি হিসেবে যাইনি, সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গেছি। ফলে আমার সঙ্গে ওখানে যা হয়েছে ইন্সট্যান্ট একটা প্রতিবাদ করা দরকার। সে কারণে আমি আসলে ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একটা পর্যায়ে তারা খুব চেষ্টা করেছে যেন আমি ভারতে প্রবেশ করি এবং আমার যে নিয়মিত কর্মকাণ্ড সেটায় অংশগ্রহণ করি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে তখন আমার মনে হয়েছে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা সিগনেচার থাকা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘একটা পর্যায়ে তারা চেষ্টা করেছে, আমি যেন ভারতে প্রবেশ করি এবং নিয়মিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেই। তবে, আমি সেটা করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেছেন। তবে এ ঘটনায় কোনো পাল্টাপাল্টি নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করা তার উদ্দেশ্য নয়।
ডা. জাহেদ বলেন, একটি বার্তা সবার কাছে যাওয়া দরকার— এটি শেখ হাসিনার সরকার নয়, এটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার। ভারতসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট নীতি রয়েছে। বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় না।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ—এই নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে সব দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক এগোবে। রাষ্ট্রের আত্মসম্মান ও মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে কিংবা নিজের ক্ষতি করে কাউকে সুবিধা দেওয়ার নীতিতে সরকার যাবে না।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করেন, এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করার মতো হওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছি। পরবর্তী বিষয়গুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকার কতটা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করবে। তার মতে, এ ঘটনা দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বা এনগেজমেন্টে প্রভাব ফেলবে না।
প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না—এই কথা ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। ডা. জাহেদ বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, ভারতের সরকার বিষয়টি বুঝবে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। যে সরকার দুই-তৃতীয়াংশ ম্যান্ডেট পেয়েছে, তার সঙ্গে আত্মমর্যাদা বজায় রেখে সম্পর্ক রাখতে হবে—এ বিষয়টি ভারতের প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকেরা বুঝবেন।
কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রসঙ্গে তিনি জানান, এখনো তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেননি। তবে এ ঘটনায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট কোনো কারণ নয়। তার পাসপোর্টে সার্ক স্টিকার দেওয়া ছিল, যা কূটনৈতিক পাসপোর্টের মতোই কাজ করার কথা। পুরো সময় বাংলাদেশের হাইকমিশনার তার পাশে ছিলেন এবং নিজের অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
ডা. জাহেদ বলেন, তিনি যে পদে আছেন, সেই পদের প্রতি যথাযথ সৌজন্যের অভাব ছিল বলে মনে হয়েছে। বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর তার মনে হয়েছে ফিরে আসবেন। একপর্যায়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে প্রবেশ করতে দিতে চাইলেও তার মনে হয়েছে, তাকে হয়রানি করা হয়েছে। তাই তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছেন।
যথাযথ আমন্ত্রণ পেলে ভবিষ্যতে ভারতে যাবেন বলেও জানান তিনি। ডা. জাহেদ বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে চায়। বাংলাদেশকে বিকিয়ে দিয়ে এই সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক করবে না। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পর্ক যে খারাপ পর্যায়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সরকার কার্যকর এনগেজমেন্ট বজায় রাখতে চায়।
জানা যায়, সোমবার দিল্লিতে শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ডা. জাহেদ উর রহমান। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তার।
কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে আগেই সফরের বিষয়টি জানানো হলেও রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেয়। পরে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি দিল্লিতে প্রবেশ না করে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার দুপুরে তিনি ঢাকায় ফেরেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ডা. জাহেদ উর রহমানের বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছিল।
এমএ//