বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি, কী করবে রিয়াদ!
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়াতে এতদিন সতর্ক অবস্থানে ছিল সৌদি আরব। তবে একাধিক দিক থেকে হামলার মুখে পড়ে এখন পাল্টা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে রিয়াদ। এরই মধ্যে চলতি সপ্তাহে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলাও চালিয়েছে সৌদি বাহিনী।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব এখন পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে, নাকি উত্তেজনা কমাতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পথে যাবে—এটাই রিয়াদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান সংঘাতে একদিকে রয়েছে ইরান ও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের সঙ্গে রয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ইরান-সমর্থিত ইরাকি পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) বিরুদ্ধেও সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহও রয়েছে এই পক্ষের সঙ্গে, যদিও বর্তমানে তারা তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও জর্ডান। তবে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমান সংঘাতে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নির্ধারিত নির্দেশনা উপেক্ষা করে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজেও হামলা চালিয়েছে। ইরাকি মিলিশিয়া ও হুথিদের সক্রিয়তা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী কোনো সমঝোতা না হলে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আরও দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেন সংঘাত এড়াতে চায় সৌদি?
সৌদি যুবরাজ ও দেশটির কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের অন্যতম বড় লক্ষ্য ‘ভিশন ২০৩০’। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে এর আওতায়।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ডেটা সেন্টার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলাও এই পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি থাকলে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
২০১৯ সালের হামলা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সে সময় ইরান-সমর্থিত একটি গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় আবকাইক ও খুরাইসের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে কয়েক দিনের জন্য সৌদির তেল রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল।
সম্প্রতি ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে আবকাইক তেল স্থাপনায় আবারও ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে।
হরমুজ বন্ধ, বাড়ছে বাব আল-মানদেবের ঝুঁকি
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের তীরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠানোর চেষ্টা করছে। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে তেল এশিয়ার বাজারে নেওয়া হচ্ছে।
তবে হুথিদের নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠায় এই বিকল্প পথও এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গেল ১৩ জুলাই সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর হুথিরা আবহা ও জিজানসহ সৌদির কয়েকটি বিমানবন্দরে পাল্টা হামলা চালায়। পরে সৌদি মালিকানাধীন জাহাজগুলোকে লোহিত সাগরে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার হুমকিও দিয়েছে তারা।
বিশেষ করে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ ও সংকীর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হামলার আশঙ্কা বাড়লে এশিয়ার বাজারে সৌদি তেল পরিবহন বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।
হুথিদের বিরুদ্ধে প্রায় সাত বছর সামরিক অভিযান চালিয়েও তাদের পুরোপুরি পরাস্ত করতে পারেনি সৌদি আরব। ২০২২ সালে রিয়াদ ও হুথিদের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। বর্তমান সংঘাত সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এমএ//