মেসির কোলে থাকা সেই শিশুই এবার তার প্রতিপক্ষ
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই প্রজন্ম, দুই সময়ের দুই প্রতীক। একদিকে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি—যার পায়ের জাদুতে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালে দলের দুই গোলেই ছিল তার নিখুঁত দুটি অ্যাসিস্ট, যা আবারও প্রমাণ করেছে বয়স কেবল একটি সংখ্যা।
অন্যদিকে অপেক্ষায় স্পেনের কিশোর বিস্ময় লামিন ইয়ামাল। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্যে আলো ছড়ানো এই তরুণ এখন দাঁড়িয়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সামনে। একদিকে শেষ বেলায় আরও একটি বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখার স্বপ্নে বিভোর মেসি, অন্যদিকে ক্যারিয়ারের শুরুতেই ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মান জয়ের হাতছানি ইয়ামালের সামনে।
এই অবিশ্বাস্য রূপকথার শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে।
কাতালান সংবাদপত্র ‘দিয়ারিও স্পোর্ত’ আয়োজিত ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সি তরুণ মেসি। বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্থানীয় সাধারণ পরিবারের শিশুদের নিয়ে এ প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইনটি করা হয়েছিল।
ভাগ্যচক্রে, মেসির কোলো তুলে দেওয়া হয়েছিল মাত্র কয়েক মাস বয়সি এক শিশুকে, যার নাম ছিল লামিন ইয়ামাল। পরম যত্নে সেই শিশুকে গোসল করানো এবং কোলে নিয়ে ছবি তোলার সময় মেসি নিজেও জানতেন না যে, তার কোলে থাকা এই ছোট্ট শিশুটিই একদিন বিশ্ব ফুটবলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে উঠবে।
বছরের পর বছর ধরে সেই ছবিগুলো সবার অলক্ষ্যেই ধুলোবালি মেখে পড়ে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে ইয়ামালের বাবা স্যোশাল মিডিয়ায় ছবিগুলো শেয়ার করতেই পুরো ফুটবলবিশ্ব চমকে ওঠে।

মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যাওয়া সেই ছবিগুলো দেখে ভক্তরা স্তব্ধ হয়ে যান— মেসির কোল আলো করে থাকা সেই ছোট্ট শিশুই যে আজকের বার্সেলোনার নতুন জাদুকর!
ইয়ামাল এরপর থেকে সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছেন। কৈশোরের গণ্ডি না পেরোতেই ক্লাব ও দেশের হয়ে একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন। অসাধারণ ড্রিবলিং, ক্ষুরধার দৃষ্টি এবং পরিণত ফুটবলীয় মস্তিষ্কের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন ইয়ামালের শৈশবের নায়ক লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক খেলছেন অবিশ্বাস্য ফুটবল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে যখন ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম, তখন শেষ মুহূর্তের দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে গেছেন ফাইনালে।
ফুটবলবিশ্ব এখন এমন এক অসম লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা রূপকথাকেও হার মানায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে এক প্রান্তে ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে আরও একটি সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার লড়াইয়ে কিংবদন্তি লিওনেল মেসি।
আর অন্য প্রান্তে ফুটবলবিশ্বে নতুন এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার প্রত্যয়ে দীপ্ত কিশোর লামিন ইয়ামাল।
উনিশ বছর আগে বার্সেলোনার এক দাতব্য ফটোশুটে কয়েক মাস বয়সী একটি শিশুকে স্নান করিয়ে কোলে তুলে নিয়েছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। সময়ের স্রোতে সেই মুহূর্তই আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। কারণ, একসময় মেসির কোলে থাকা সেই শিশুই আজ বিশ্বকাপের ফাইনালে দাঁড়াবে তার বিপরীত প্রান্তে।
একটি ছবিতে শুরু হওয়া গল্প এখন পৌঁছে গেছে ফুটবলের সবচেয়ে মহিমান্বিত মঞ্চে। একদিকে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আরেকটি বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখার স্বপ্নে বিভোর কিংবদন্তি মেসি, অন্যদিকে নতুন যুগের প্রতীক লামিন ইয়ামাল—যার সামনে হাতছানি দিচ্ছে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস। এখন শুধু অপেক্ষা, ফুটবলের সোনালি মুকুট শেষবারের মতো উঠবে কিংবদন্তির হাতে, নাকি শুরু হবে নতুন এক সাম্রাজ্যের গল্প।
এসি//