বিতর্কিত উদযাপনে ফাইনালের আগে শাস্তির শঙ্কায় আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে জয়ের আনন্দের মধ্যেই নতুন বিতর্কে জড়িয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের হাতে ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’ লেখা একটি ব্যানার দেখা যায়, যা ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড-সংক্রান্ত বিরোধের ইঙ্গিত বহন করে। রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত ওই ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় ফিফার আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের আগে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সম্ভাব্য শাস্তির মুখে পড়তে পারে।
বুধবার (১৫ জুলাই) আটলান্টায় অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে ম্যাচের শেষ পাঁচ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। পরপর দুটি গোল করে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে তারা। এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয় দলটি। আগামী রোববার (১৯ জুলাই) নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে স্পেন আগেই নাম লিখিয়েছে।
তবে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর ফুটবলের বদলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে একটি ব্যানার। উদযাপনের সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস ও মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসো হাসিমুখে ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’ লেখা ব্যানারটি হাতে তুলে গ্যালারিতে থাকা সমর্থকদের উদ্দেশে নাড়াতে থাকেন। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা "Las Malvinas son Argentinas" বাক্যটির বাংলা অর্থ, ‘ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) আর্জেন্টিনার’। ব্যানারটি কোথা থেকে এসেছে, তা স্পষ্ট না হলেও এর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড-সংক্রান্ত বিরোধ আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।
ব্রিটেনে যে দ্বীপপুঞ্জ ‘ফকল্যান্ড আইল্যান্ডস’ নামে পরিচিত, আর্জেন্টিনায় সেটিই ‘ইসলাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত। এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনব্যাপী যুদ্ধ হয়েছিল। সেই সংঘাতে প্রাণ হারান ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য।
বিশ্বকাপে রাজনৈতিক বার্তা ঘিরে বিতর্ক এবারই প্রথম নয়। গত মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের একটি ম্যাচে দেশটির বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতীক হিসেবে প্রাক-বিপ্লবী ইরানি পতাকা প্রদর্শন করেছিলেন ইরানি-আমেরিকান সমর্থকেরা। যদিও সেই ম্যাচে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার আগেই বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়কে স্লোগান দিতে শোনা যায়—‘মালভিনাসের জন্য, দিয়েগো মারাদোনার জন্য এবং লিও মেসির শেষ বিশ্বকাপের জন্য।’
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই লড়াই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি দিয়েগো মারাদোনার স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে। মালভিনাস যুদ্ধে নিহত বীরদের স্মরণ করতেই তারা গান গেয়ে থাকেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, মালভিনাস ইস্যু এবং ফুটবলকে আলাদা করেই দেখা উচিত।
তার মতে, যুদ্ধ ছিল একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি, তাই নিহতদের স্মরণ করা জরুরি। তবে মাঠে তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে পৌঁছানো।
এদিকে ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধি অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের ভেতরে রাজনৈতিক, আপত্তিকর কিংবা বৈষম্যমূলক বার্তাসংবলিত ব্যানার, পতাকা, লিফলেট, পোশাক বা অন্য কোনো উপকরণ প্রদর্শনের অনুমতি নেই। বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধ জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ফাইনালকে সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা।
দেশটির নিরাপত্তামন্ত্রী আলেহান্দ্রা মন্তেওলিভা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ফাইনাল ঘিরে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে প্রায় ১ হাজার ৬০০ নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। লক্ষ্য একটাই—উদ্যাপন যেন শান্তিপূর্ণ থাকে এবং রাজনৈতিক বা বর্ণগত উসকানিমূলক কোনো বার্তা স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা লড়াই বরাবরই আবেগ, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ছোঁয়া বহন করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। মাঠের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা, কিন্তু ম্যাচ-পরবর্তী একটি ব্যানার ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে আবারও ফিরিয়ে এনেছে চার দশকেরও বেশি পুরোনো এক বিরোধের স্মৃতি।
এসি//