‘এখানেই শেষ’ বলে কি আভাস দিলেন নেইমার?
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়েছে নরওয়ের কাছে ২–১ গোলের পরাজয়ে। তবে এই হারের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু বিদায় নয়, বরং নেইমারের ভবিষ্যৎও। শেষ ষোলোর লড়াই শেষে আবেগঘন কণ্ঠে এমন কিছু কথা বলেছেন ব্রাজিলের এই তারকা, যা জাতীয় দলের জার্সিতে তার পথচলার সমাপ্তির ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবো টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৩৪ বছর বয়সী নেইমার বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি। সত্যিই চেষ্টা করেছি। এখানেই আমার শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ করলাম। এখন সব শেষ।”
তার এই মন্তব্যের পর থেকেই জোরালো হয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের আলোচনা।
নেইমারের জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের ১০ আগস্ট। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয় তার। সেই ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। প্রায় ১৬ বছর পর একই মাঠে নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচ খেলেই বিদায়ের ইঙ্গিত দিলেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
নরওয়ের বিপক্ষে শুরু থেকে মাঠে ছিলেন না নেইমার। ডান পায়ের কাফ মাসলের দীর্ঘদিনের চোট পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই তাকে ভুগিয়েছে। ব্রাজিলের পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে তিনি খেলতে পেরেছেন মাত্র দুটি। গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ১৫ মিনিট মাঠে ছিলেন, আর নরওয়ের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন।
কিন্তু সেই গোলও পরাজয় ঠেকাতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার। সতীর্থরা এগিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম বেদনাদায়ক মুহূর্ত ছিল সেটি।

এই বিদায়ের মাধ্যমে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ হতাশাও আরও দীর্ঘ হলো। ১৯৯০ সালের পর এবারই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বাজে ফল করল সেলেসাওরা। ২০০২ সালের পর আর শিরোপা জেতা হয়নি তাদের। ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত অপেক্ষা গড়ালে ব্রাজিলের শিরোপাখরা দাঁড়াবে ২৮ বছরে, যা ১৯৫৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা হবে।
ব্যক্তিগতভাবেও এটি নেইমারের ক্যারিয়ারের এক অপূর্ণ অধ্যায়। চারটি বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপার স্বাদ পেলেন না তিনি। এর আগে একই আক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন ব্রাজিলের সাবেক অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা। নেইমার এখন সেই তালিকায় যোগ হওয়া দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান।
যদি “এখন সব শেষ” কথার মধ্য দিয়েই তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে থাকেন, তবে ব্রাজিলের হয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হবে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল এবং ৫৮টি অ্যাসিস্ট নিয়ে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তার নাম ইতোমধ্যেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।
ব্রাজিলের জার্সিতে তার একমাত্র বড় শিরোপা আসে ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপে। এছাড়া ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে অনূর্ধ্ব–২৩ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে এনে দেন বহু প্রতীক্ষিত অলিম্পিক স্বর্ণপদক।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা ছিলেন নেইমার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক চোট তার ছন্দ ও প্রভাব দুটোই কমিয়ে দেয়। এখন ব্রাজিল প্রবেশ করছে নতুন এক অধ্যায়ে, যেখানে দায়িত্ব তুলে নিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে।
দলের অধিনায়ক মার্কুইনহোসও সেই বার্তাই দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাইকে অনুরোধ করছি, নতুন প্রজন্মের প্রতি ধৈর্য ধরুন এবং শুরু থেকেই তাদের সমর্থন করুন।”
হয়তো নেইমারের চোখের জল ছিল শুধু একটি ম্যাচ হারার বেদনা নয়; ছিল দীর্ঘ ১৬ বছরের এক বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্যও।